জসীমউদ্দীন ইতি ঠাকুরগাঁও।
ঠাকুরগাঁওয়ের জনপদে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘদিনের যে হাহাকার, তা লাঘব হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সাম্প্রতিক সফর এবং মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া জেলাবাসীর জন্য একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে যে দাবিটি উত্থাপিত হচ্ছিল, শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনের মাধ্যমে তা একটি বাস্তব রূপরেখা পেল।
প্রতিনিধি দলটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সংলগ্ন পুরাতন হাসপাতাল এবং সত্যপীর ব্রিজ সংলগ্ন বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এলাকাকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করেছেন। এটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত। কারণ, বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে যদি দ্রুত মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু করা যায়, তবে তা যেমন সময় সাশ্রয়ী হবে, তেমনি সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে স্থায়ী ভিত্তিতে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আমরা জানি, ঠাকুরগাঁও ভৌগোলিকভাবে একটি সীমান্তবর্তী জেলা। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার জন্য এখানে বসবাসকারী মানুষকে প্রতিনিয়ত ছুটতে হয় রংপুর কিংবা দিনাজপুরের দিকে। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় অনেক রোগী মুমূর্ষু অবস্থায় আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অকাল মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হলে এই জনদুর্ভোগের অবসান ঘটবে। মানুষ হাতের নাগালেই পাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা এবং অত্যাধুনিক রোগ নির্ণয়ের সুযোগ।
শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, একটি মেডিকেল কলেজ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। মেডিকেল কলেজকে ঘিরে গড়ে উঠবে নতুন নতুন ফার্মেসি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আবাসন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক অবকাঠামো। এটি স্থানীয় পর্যায়ে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, আমাদের জেলার মেধাবী শিক্ষার্থীরা চিকিৎসাবিদ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পড়ার জন্য আর দূরে কোথাও যেতে বাধ্য হবে না। নিজের জেলায় থেকেই তারা দক্ষ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
তবে এই প্রকল্পের সাফল্যের পথে মূল চ্যালেঞ্জ হলো সময় ও স্বচ্ছতা। সরকারি প্রকল্প মানেই অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভয় থাকে। আমরা আশা করব, ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষার এই সময়টিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ হবে স্বচ্ছ এবং দ্রুত। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে যেন কাজের গতি কোনোভাবেই শ্লথ না হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজ শুধু একটি সরকারি ভবন নয়, এটি উত্তরের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই গুরুত্ব অনুধাবন করে কাজ এগিয়ে নেবেন—এটাই ঠাকুরগাঁওবাসীর প্রত্যাশা। আমরা চাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ক্যাম্পাসে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রথম ক্লাস শুরু হোক এবং ঠাকুরগাঁও হয়ে উঠুক মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার একটি আধুনিক কেন্দ্র।
