।। এবিএম ফজলুর রহমান।।
মহানয়িকা সুচিত্রা সেন, উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত গীতিকার গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, ওস্তাদ বারীন মজুমদার, কবি বন্দে আলী মিয়া, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন আহমেদসহ অসংখ্য গুনি সাংষ্কৃতিক ও সাহিত্যিকের জন্মভুমি পাবনা। ব্রিটিশ পরবর্তি শাসনামলপুর্ব এ অঞ্চলে সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে। পঞ্চাশের দশকে হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিকতা শুরু করেন। তারই ধারবাহিকতায় ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত দি ডেইলি জং পরবর্তিতে ইংরেজি ডেইলি ডন এবং অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি) পাবনা জেলা প্রতিনিধি ভাষা সংগ্রামী একেএম আজিজুল হক বিএসসি ক্যাল এর নেতৃত্বে তৎকালীন এক ঝাঁক তরুন সাংবাদিক প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী পাবনা প্রেসক্লাব ও পুর্বপাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এপিপি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) হিসেবে রাষ্ট্রিয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া তিনি ‘পাক হিতৈষি’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও জেলার সাংবাদিকতার বাতিঘর একেএম আজিজুল বিএসসি ক্যালের আজ ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে পাবনা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা এবং পরিবারের পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি ছিলেন দেশের মর্যাদাশীল সাংবাদিকতার এক প্রতিচ্ছবি। নিভৃতচারী অকুতোভয় ও পেশারিত্বের ব্যাপারে আপোষহীন ছিলেন তিনি। যিনি ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পুর্বপাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। যা বর্তমানে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের দাবি আদায়ে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি হিসেবে কাজ করছে। তিনি ছিলেন পাবনার সাংবাদিতকতায় সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাংবাদিক ভাষা সংগ্রামী একেএম আজিজুল হক ১৯৬৫ সাল থেকে পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত দি ডেইলি জং পরবর্তিতে ইংরেজি ডেইলি ডন এবং অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি) পাবনা জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এপিপি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) হিসেবে রাষ্ট্রিয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া তিনি ‘পাক হিতৈষি’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন।
১৯১৯ সালের ১ ফেব্রæয়ারি পাবনা শহরেরে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এ কে এম আজিজুল হকের জন্ম। তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি পাশ করেন। তিনি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রেমী ছিলেন। নারী শিক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৫ সালে পাবনার মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ২০১২ সাল থেকে তিনবার পাবনায় এ কে এম আজিজুল হক স্মৃতি সাংবাদিকতা পুরষ্কার দেয়া হয়।
পঞ্চাশের দশকে তিনি তার ‘সানভিউ ভিলা’ নামক বাসায় পাবনার সাংবাদিকতার গোড়াপত্তন ঘটান। তার সহকর্মি ছিলেন প্রখ্যাত বা সংগঠক প্রয়াত রণেশ মৈত্র, এম আনোয়ারুল হক, মির্জা শামসুল ইসলাম, হাসনাত উজ্জামান হীরা, তার বাবা মেজর ডা. মোফাজ্জল হোসেন শহীদ শিক্ষক মাওলানা কসিমুদ্দন।
পাবনা জেলায় সাংবাদিকতার পথিকৃত হিসেবে তার নাম চির স্মরনীয় বরণীয় হয়ে থাকবে। গুরু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন আমৃতুকাল। সমগ্র বাংলাদেশে বিশিষ্ট সাংবাদিক হিসাবে যাঁর নাম খ্যাতির শীর্ষে নিরন্তর সাফল্য গাথা এমনি এক আভিজাত্যপুর্ন ব্যক্তিতের অধিকারী ছিলেন তিনি।
পাবনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার বছরেই ৮ ও ৯ মে পাবনায় অনুষ্ঠিত হয় পুর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সম্মেলন। যে সভা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় পুর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সমিতি যা বর্তমানে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি হিসেবে পরিচিত। সেই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রীসভার সদস্য বগুড়ার মো: হাবিবুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক আব্দুস সালাম, মনিং নিউজের এসজিএম বদরুদ্দিন। যে সম্মেলনের মাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকরা পেশার স্বীকৃতি তথা রিটেইনার, লাইনেজ, পোষ্টাল চার্জ, টেলিগ্রাম চার্জ, ছবির বিলসহ অন্যান্য খরচ পাওয়া শুরু করেন। পাবনা প্রেসক্লাব ও পুর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই সেদিন সংবাদপত্রে মফস্বলে কর্মরত প্রতিনিধিদের পেশার স্বীকৃতি ঘটেছিল। এখন ঢাকার বাইরে অনেকে এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন।
পাবনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার পর একেএম আজিজুল হক পাবনা প্রেসক্লাবের প্রথম সভাপতি এবং দৈনিক সংবাদ প্রতিনিধি রণেশ মৈত্র প্রথম সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তিতে এম আনোয়ারুল হক, মির্জা শামসুল ইসলাম, প্রফেসর আব্দুস সাত্তার বাসু, অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, রবিউল ইসলাম রবি, অ্যাডভোকেট মুহম্মদ মহিউদ্দিন, প্রফেসর শিবজিত নাগ, আব্দুল মতীন খান, এবিএম ফজলুর রহমান, রুমী খন্দকার, উৎপল মির্জা, আহমেদ উল হক রানা, আখিনুর ইসলাম রেমন, সৈকত আফরোজ আসাদ বিভিন্ন সময় এক বা একাধিকবার সভাপতি সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে আখতারুজ্জামান আখতার সভাপতি ও জহুরুল ইসলাম সরাসরি ভোটে সাধারণ সম্প।দক নির্বাচিত হয়ে ঐতিহ্যবাহি এই প্রেসক্লাবের দায়িত্ব পালন করছেন।

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান,
সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব ও
স্টাফ রির্পোটার দৈনিক সমকাল, পাবনা।
