জাদু টানা’র নামে নরবলি ও সোনার কলসের মরিচীকা: সমাজ আর কত নাসিমাকে হারাবে?

জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ভাতুড়িয়া ইউনিয়নের ফজিলপুর এলাকায় সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া তিন সন্তানের জননী নাসিমা আক্তারের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের যে লোমহর্ষক ও গা শিউরে ওঠা বিবরণ জেলা পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, তা কেবল একটি সাধারণ অপরাধের খতিয়ান নয়। এটি মূলত একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও আমাদের সমাজমানসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা আদিম কুসংস্কার, অন্ধত্ব এবং চরম নৈতিক স্খলনের এক জীবন্ত দলিল। অলৌকিক উপায়ে ‘সোনার কলস’ পাওয়ার অন্ধ মোহ, দীর্ঘ এক বছরের পরিকল্পিত প্রতারণার জাল এবং পরিশেষে ‘জাদু টানা’র নামে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে একজন নারীকে হত্যা করার এই ঘটনা আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থাকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অপরাধের এখানেই শেষ নয়, পরিচয় গোপন ও আইনি চোখকে ফাঁকি দিতে লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো যে বিকৃত মনস্তত্ত্ব খুনি দেখিয়েছে, তা সুস্থ কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই খুনি শামসুল হকদের মতো ছদ্মবেশী নরপশুরা আমাদের চোখের সামনে, আমাদেরই চারপাশেই বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় সচেতন মহল এবং ভিকটিমের প্রতিবেশী একজন গণমাধ্যমকর্মীর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গভীর ও প্রণিধানযোগ্য। তাঁর ভাষ্যমতে, যে লোকটির শরীর চলত না, চরম অলস প্রকৃতির কারণে যিনি কোনো কাজকর্ম করতেন না, তিনি হঠাৎ করেই অল্প সময়ের ব্যবধানে কীভাবে ‘অলৌকিক ক্ষমতার’ তান্ত্রিক বা বড় কবিরাজ বনে গেলেন? এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক প্রশ্ন। মানুষের রাতারাতি ভাগ্য বদলানোর গোপন লোভ, চরম মানসিক অসহায়ত্ব কিংবা অন্ধ সরলতা—এসব দুর্বলতাকে পুঁজি করেই শামসুল হকরা সমাজজুড়ে এক একটি অদৃশ্য মরণফাঁদ পেতে বসে। ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর যখন রাণীশংকৈলের হোসেনগাঁও গ্রামের গৃহবধূ নাসিমা আক্তার কাঁঠাল ডাঙ্গী বাজারে দেখা করে নিজের পাওনা বা প্রতিশ্রুত সোনার কলসের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, তখনই এই ভণ্ড তান্ত্রিক তার আসল হিংস্র রূপ ধারণ করে। নির্জন সড়কের পাশে ‘জাদু টানা’র নামে ভুয়া আচার-অনুষ্ঠানের নাটক সাজিয়ে, রশির দুই প্রান্তে বাঁশের কঞ্চি বেঁধে চারপাশে দাগ কেটে যেভাবে একটি জলজ্যান্ত মানুষকে ফাঁদে ফেলে শ্বাসরোধ করা হলো, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।

তবে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সমান্তরালে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ এবং বিশেষ করে হরিপুর থানা পুলিশের ভূমিকা নিঃসন্দেহে সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসা ও ধন্যবাদের দাবিদার। গত ১ জুন সকালে একটি অজ্ঞাত এবং আংশিক দগ্ধ লাশ উদ্ধার করার পর যখন কোনো ক্লু ছিল না, তখন প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার, গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই অন্ধকূপের জট খোলা এবং মূল আসামিকে গ্রেফতার করা পুলিশের এক দুর্দান্ত পেশাদারিত্বের প্রমাণ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের এই ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে খুনি পার পেয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি। এর জন্য পুলিশ প্রশাসনকে আমাদের আন্তরিক স্যালুট।

কিন্তু কেবল পুলিশি তৎপরতা বা ঘটনার পর আসামি গ্রেফতার করেই কি এই গভীর সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়। আজ সময় এসেছে আমাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করার। কেন আমাদের মা-বোনেরা এখনও অলৌকিক উপায়ে ধনী হওয়ার এই অলীক মরিচীকা ও অন্ধবিশ্বাসের ফাঁদে পা দিচ্ছেন? কেন সমাজ শুরুতেই এই ভণ্ড কবিরাজ, তান্ত্রিক, ঝাড়ফুঁক আর গুপ্তধনের নামে চলা প্রতারণার আস্তানাগুলোকে চিহ্নিত করে বয়কট করছে না? গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন সমাজ যদি শুরু থেকেই এই ভণ্ডদের মুখোশ উন্মোচন করতে সোচ্চার না হয়, তবে কেবল নাসিমা আক্তারের পর নাসিমাই ঝরে যাবে, অপরাধের এই মরণচক্র কোনোদিন থামবে না।

এখন প্রথম ও প্রধান কাজ হলো, এই ভণ্ড ও খুনি শামসুল হকের মতো নরপশুদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার আইনি কার্যক্রম দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি (ফাঁসি) নিশ্চিত করা। এই শাস্তি যেন সমাজ ও অন্যান্য ভণ্ড প্রতারকদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করে। একই সাথে, প্রশাসনকে তৃণমূল পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে এই ধরনের সমস্ত ভণ্ড তান্ত্রিকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। সর্বোপরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গণমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা ও যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সমাজ নিজের মনস্তত্ত্ব থেকে এই অন্ধবিশ্বাস দূর করতে না পারলে, এই ভণ্ডদের থাবা থেকে আমাদের পরিবারকে রক্ষা করা কোনোদিনই সম্ভব হবে না। নাসিমা আক্তারের এই করুণ মৃত্যু যেন আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলার শেষ সতর্কবার্তা হয়।