ওসমান গনি বেড়া পাবনা প্রতিনিধি:
পাবনার বেড়ায় একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে খেলোয়াড় ও দর্শকদের মধ্যে দফায় দফায় মারামারি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। রোববার বিকেল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে ৩ জন গুরুতর আহতসহ অন্তত শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথ অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, বেড়া বিএমএস বনানী সংঘের উদ্যোগে স্থানীয় বিবি হাই স্কুল মাঠে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। রোববার বিকেলে বেড়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে অনুষ্ঠিত ম্যাচে খেলার প্রথমার্ধে ২ নম্বর ওয়ার্ড ২-০ গোলে এগিয়ে থাকে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ৯ নম্বর ওয়ার্ড খেলায় সমতা ফিরালে (২-২) মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং দুই পক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে মারমুখী আচরণ শুরু হয়।
একপর্যায়ে ২ নম্বর ওয়ার্ডের সওদাগর (সান্দার) সম্প্রদায়ের একাংশ মাঠে প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আয়োজক কমিটি মাইকে বিশৃঙ্খলাকারীদের ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলে ঘোষণা দিলে সওদাগর সম্প্রদায়ের লোকজন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ওই সওদাগররা বেড়া বাজারে প্রবেশ করে দোকানপাটে হট্টগোল, ভাঙচুর ও লুটপাট চালাতে থাকে।
এ সময় বাজারে নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিশিষ্ট টিন ব্যবসায়ী শরীফ হাজী এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী জানু খাঁ। ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা ও লুটপাটের খবর আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা সওদাগর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এতে উভয় পক্ষ রাত পর্যন্ত ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সংঘর্ষে সাদ্দাম হোসেন নামে আরও একজন গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
খবর পেয়ে বেড়া মডেল থানার ওসি নয়ন কুমার সরকারের নেতৃত্বে পুলিশ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। সংঘর্ষের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা বেশি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও রাবার বুলেট ছুঁড়তে বাধ্য হয়। মারামারির তীব্রতার খবর পেয়ে বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ প্রচেষ্টায় দীর্ঘ সময় পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা বলেন:
“একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে যে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পরপরই আমি নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। এই সংঘর্ষে সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো ধরনের সংঘাত এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনায় জড়িত অপরাধী ও বিশৃঙ্খলাকারীদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরিস্থিতি বর্তমানে পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
বেড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার সরকার বলেন,
”পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপের মতো কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি টহল বাড়ানো হয়েছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।”
বর্তমানে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
