মুহাররম ও আশুরার তাৎপর্য

এবাদত আলী

মুহাররম মাস চন্দ্র মাসের প্রথম মাস | ইসলামের বিধান অনুযায়ী যে সকল চন্দ্র মাসে খুন খারাবি , যুদ্ধ বিগ্রহ সম্পুর্নরূপে নিষিদ্ধ – মুহররম মাস তার অন্যতম | এই মাস অত্যাধিক মর্যাদাশীল মাস| এ মাসের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ ) বিভিন্ন ভাবে বাণী ও হাদিস দিয়ে গিয়েছেন | বহু কিতাবে মুহাররম মাসের ফজিলত বর্নিত আছে | হযরত আয়েশা সিদ্দিকা ( রাঃ ) হতে রাইয়্যাহীন কিতাবে বর্নিত আছে, যে ব্যক্তি মুহররম মাসের প্রথম রাতে দু রাকাত নফল নামাজের প্রত্যেক রাকাতে সুরা ফাতেহার পর দশবার সুরা এখলাছ পড়বে তার ও তার পরিবারবর্গের জন্য হযরত (সাঃ) শাফায়াত করবেন |
হাদিস শরীফে হযরত নহুর (রঃ) হতে এরূপ বর্নিত আছে তিনি তাঁর পিতার নিকট হতে উত্তম সনদ সহ জানতে পেরেছেন যে, মোজাহিদ (রঃ) এবং ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন ুরাসুলুল্লাহ (সাঃ) ফরমায়েছেন -যে ব্যক্তি মুহাররম মাসে একদিন রোজা রাখে তার এক দিনে ত্রিশ দিনের সাওয়াব হবে |
হযরত ইব্রাহীম (অঃ) এর সময়কাল হতে আরব দেশে যে চারটি মাসকে অত্যাধিক মর্যাদার মাস হিসাবে গুরুত্ব প্রদান করা হতো মুহররম মাস তার মধ্যে অন্যতম | অন্যান্য তিনটি মাস যেমন রজব, জিলক্বদ ও জিলহজ্ব | এই চারটি মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ থাকতো |
ইসলামের আবির্ভাবের আগে আরব দেশে প্রচলিত চন্দ্র সালের প্রথম মাসকে সফর আউয়াল এবং দ্বিতীয় মাসকে সফর সানি বলা হতো | পরবর্তীকালে সফর আউয়ালকে মুহররম হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় | মুহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা | আরবি ভাষায় আশারা শব্দের অর্থ দশ | এই আশারা হতে আশুরার উৎপত্তি ঘটেছে |
বিভিন্ন গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর প্রিয় পয়গ¤^রদের দশটি অনুগ্রহ দান করেছিলেন | এ কারনেই এর নামকরণ করা হয়েছে আশুরা| আবার মুহররম মাসের ১০ তারিখে সংঘটিত হয়েছে সৃষ্টিজগতের নানাবিধ ঘটনা | মহান আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে এমন সব ঘটনা ঘটিয়েছেন যা এদিনকে বছরের অন্যান্য দিন অপেক্ষা অধিকতর শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত করেছে| ফলে এ দিনটি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র মানব জাতির জন্য পরম পবিত্র ও বরকতময় |
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র আশুরার দিনেই আরশ , কুরছি, লওহ কলম, আসমান জমিন সৃষ্টি করে প্রভু হিসাবে নিজে আরশে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন | বিশ্বজগত সৃষ্টির সুচনা হয়েছিলো আদি আশুরাতে|
বিশ্ব জগত সৃষ্টির ও বহু পরে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম(আঃ) এর দেহে রূহু বা প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছিলো এই আশুরাতে| মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এবং মাতা হাওয়া (রাঃ) কে বেহেস্তের মধ্যে রাখা অবস্থায় আল্লাহর হুকুম অমান্য করে নিষিদ্ধ ফল ভক্ষনের অপরাধে তাঁদেরকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এই আশুরার দিনে | পৃথিবীতে এসে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে অনুতাপ সহকারে ক্রন্দন করে ছিলেন তাঁরা | অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁদের দোয়া কবুল করেন আশুরাতে| হযরত নূহ (আঃ) এর সময় তিনি সাড়ে নয়শ বছর যাবত তাওহিদের বাণী প্রচারের পর যখন সে যুগের মানুষ আল্লাহর বিধি নিষেধ পালনে অ¯^ীকৃতি জানায় ু তখন তাদের উপর আল্লাহর গজব নিপতিত হয় | শুরু হয় মহা প্লাবন | সেই মহা প্লাবন হতে রক্ষা পাবার জন্য আল্লাহর নির্দেশে একটি কিস্তি ˆতরি করে তাতে অনুসারিগণসহ আরোহন করেন | প্লাবন শেষে তিনি যে দিন জুদি পাহাড়ের পাদদেশে অবতরন করেন সে দিনটি ছিলো আশুরা | পবিত্র আশুরার দিনে হযরত ইব্রাহীম ( আঃ ) ভূমিষ্ঠ হন | এই দিনে তিনি নমরূদের অগ্নিকান্ড থেকে উদ্ধার লাভ করেন | পবিত্র আশুরার দিন ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া (রাঃ) শিশুপুত্র হযরত মুছা ( আঃ ) কে গ্রহণ করেছিলেন | এই দিনে হযরত মুছা (আঃ) তাঁর কওমের লোকজন সহ নীল নদ অতিক্রম করেন | পক্ষান্তরে ফেরাউন সদলবলে নীল নদে ডুবে মৃত্যুবরণ করে | হযরত ইউনুছ ( আঃ ) মাছের পেট হতে এ দিন মুক্তি লাভ করেন | পবিত্র আশুরার দিনে হযরত আইয়ূব (আঃ) কঠিন রোগ হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন | হযরত ঈসা (আঃ) এ দিন জন্মগ্রহন করেছিলেন | এ এদিনই চতুর্থ আসমানে তাঁকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিলো | এদিনে হযরত সোলায়মান (আঃ) হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছিলেন | হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর হারানো পুত্র হযরত ইউছুফ (আঃ) কে ফিরে পেয়েছিলেন এই দিনে | এই দিনে দু হাজার বা ততোধিক সংখ্যক নবী রাসুলকে মহান আল্লাহ পাক জগতে প্রেরণ করেছিলেন এবং দু হাজার নবীর দোয়া আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন | রাহমাতাল্লিল আলামীন হযরত রাসুল (সাঃ) এর পবিত্র রূহু আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন এই আশুরার দিনে | প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর দরবারে হযরত জিবরাঈল (আঃ) রহমত বহন করে সর্ব প্রথম আগমণ করেন এ দিনে | পবিত্র আশুরার দিনে হযরত নবী করিম (সাঃ) এর সঙ্গে হযরত খাদিজা (রাঃ) এর সাদী মোবারক সম্পন্ন হয়| দশই মুহররম পবিত্র আশুরাতেই কিয়ামত সংঘটিত হবে | আশুরার মাহাত্ব সম্পর্কে হাদীস শরীফে বিস্ত বর্ণনা রয়েছে | রমজান মাসে রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে প্রিয় নবী (সাঃ) নিজে এবং তাঁর নির্দেশে সাহাবাগণ রোজা পালন করতেন | হুজুর (সাঃ) ফরমায়েছেন , “রমজানের সিয়ামের পর উত্তম সিয়াম হচ্ছে আশুরার সিয়াম | ” তিনি ফরমান আশুরার দিবসে রোজা রাখা হযরত আদম (আঃ) সহ অন্য নবীদের উপর ফরজ ছিলো | তিনি এরশাদ করেছেন বনি ইসরাঈলের উপর সারা বছরে মুহররমের দশ তারিখের আশুরার রোজা ফরজ ছিলো | অতএব মুসলমানদেরও কর্তব্য আশুরার দিন রোজা রাখা এবং পরিবারগণকে তৃপ্তির সাথে আহার করানো | কেননা এই দিনের বরকতে আল্লাহ তায়ালা সারা বছর সুখ ¯^াচ্ছন্দে রাখেন | এই দিনে রোজা রাখলে আল্লাহ তায়ালা ৪০ বছরের গোনাহ& মার্জনা করে দেন | ফরজ নামাজ ব্যতীতে অর্ধ রাতের পর যে সব নামাজ পড়া হয় তার মধ্যে আশুরার নামাজ সব চেয়ে বেশি মর্যাদা সম্পন্ন |
পরবর্তীকালে পবিত্র আশুরার দিনটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে যে কারণে সবচেয়ে স্মরণীয় হ্রদয় বিদারক তা হলো খোলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ) এর ওফাতের পর আমীর মুয়াবিয়া মুসলিম জাহানের খলিফা হন এবং তার মৃত্যুর পূর্বেই ¯^ীয় পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা মনোনীত করেন | কিন্তু হযরত আলী ( রাঃ) এ দ্বিতীয় পুত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ ) ইয়াজিদকে খলিফা বলে ¯^ীকার করেননি | কারন যে ব্যক্তি ইসলামের নীতি বহির্ভূত খলিফা পদে আসীন হয়ে পাপ কর্মে লিপ্ত সে কখনো খলিফার উপযুক্ত নয় | মোনাফেক ও ইহুদী চক্রের হোতা নরাধম ইয়াজিদ ˆ¯^রাচারী কান্ড কারখানা করতে থাকলে এরই প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন সত্যের ˆসনিক হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) | হযরত আলী (রাঃ) এ জীবদ্দশায়ই খিলাফতের রাজধানী মদীনা থেকে কুফাতে স্থানান্তর করেছিলেন| হযরত মুয়াবিয়া পূর্ব থেকেই দামেস্কের গভর্নর ছিলেন | তিনি খলিফা হয়ে রাজধানী দামেস্কে স্থানান্তর করেন | এই দামেস্কের মসনদেই ইয়াজিদ আসীন হয় | কুফার জনগণ ইয়াজিদকে খলিফা হিসাবে মেনে নিতে পারলেননা| তাঁরা হযরত হোসাইন (রাঃ) কে চিঠির পর চিঠি দিয়ে কুফায় যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন | হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) চিঠি গুলোর সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিল কে কুফায় পাঠিয়ে দেন | হযরত মুসলিম বিন আকিল কুফায় গিয়ে দেখতে পান যে সত্যি সত্যিই কুফার মানুষ হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) কে চায় | তিনি তাই হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) কে কুফায় যাবার জন্য পত্র পাঠালেন |
পত্র পেয়ে হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) পরিবার পরিজন সহ ৭০/৭২ জন সঙ্গী নিয়ে কুফায় রওনা হন | এ দিকে কুফায় অবস্থার আমুল পরিবর্তন ঘটালো ইয়াজিদ চক্র | ইয়াজিদ কর্তৃক নিয়োজিত নতুন গভর্নর ওবায়দুল্লা বিন জেয়াদ কুফায় গিয়ে কুট কৌশল প্রয়োগ করে কুফাবাসিকে বশীভুত করে ফেলে | হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর দূত মুসলিম বিন আকিল কে বন্দি করে নির্মম ভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হলো| হযরত ইমাম হোসাইন ( রাঃ ) কুফার সীমান্তে পৌছলে ওবায়দুল্লাহ বিন জেয়াদের সৈন্যরা তাঁকে বাধা দান করে | অগত্যা তিনি কুফা থেকে ৪২ মাইল দুরে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা নামক স্থানে তাবু স্থাপন করলেন | ইয়াজিদ বাহিনীর প্রায় ২২ হাজার ˆসন্য সেই তাবু গুলো চার দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে| ফোরাত নদী হতে পানি আনার পথ ও বন্ধ করা হলো|
এ হেন অবস্থা নিরসনের জন্য হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতির কাছে প্রস্তাব পাঠালেন এই বলে যে , আমাকে মদীনায় ফিরে যেতে দাও অথবা আমাকে ইয়াজিদের নিকট নিয়ে চলো | কিন্তু কোন প্রস্তাবেই দুরাচার সেনাপতি আমল দিলোনা | ৬১ হিজরী মোতাবেক ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মুহররম এক অসম যুদ্ধ শুরু হয় | ইয়াজিদ ˆসন্যরা প্রথমে তাঁকে বশ্যতা ¯^ীকারের প্রস্তাব দেয় | হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন | পানির অভাবে ইমাম পরিবারের শিশুরা মারা যেতে থাকে | একে একে ইমামের অনুরাগীগণ যুদ্ধে নিষ্ঠুর ভাবে শহীদ হন | তাবুতে তাবুতে কান্নার রোল ওঠে | সখিনার হাতের মেহেদী আঁকা কাঁচা রঙ মুছতে না মুছতেই হযরত কাসেম (রাঃ) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন | ইমাম পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া | হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন | প্রথমে তিনি শত্রুদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন | এ সময় তিনি একটি তীরের আঘাতে মাটিতে পড়ে গেলে সীমার নামক এক পাষন্ড তাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা করে এবং তাঁর শিশু পুত্র জয়নাল আবেদীন সহ মহিলাদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় ইয়াজিদের দরবারে | এ ভাবেই বনু হাশেমী গোত্রের নির্মম পরিণতি ঘটে |
মুসলিম জাহানের শাসন ক্ষমতা ˆ¯^রাচারী ইয়াজিদের হাতে চলে যায় | হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) এর শহীদ হবার মধ্য দিয়ে সত্যের বিজয় নিশান উন্নীত হয়েছে | পবিত্র আশুরার দিনে ঘটেছে অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার ঘটনাবলী | আশুরা আত্ম ত্যাগের মহিমায় ভা¯^র | ১০ মুহররম তথা আশুরার সেই উপলব্ধি সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করে| (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)|

এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ: ২৩/০৬/২০২৬