তিলে তিলে জমানো ২ লাখ টাকা উইপোকার পেটে, সুন্দরগঞ্জে নিঃস্ব দম্পতি

হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধিঃ
বৃদ্ধ বয়সে একটু স্বচ্ছলভাবে জীবন কাটাবেন, এই আশায় দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে কষ্ট করে তিলে তিলে টাকা জমিয়েছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের দক্ষিণ ধুমাইটারী গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম। কিন্তু সেই সঞ্চয়ের ২ লাখ টাকা উইপোকা কেটে টুকরো-টুকরো করে ফেলেছে। জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে এখন দিশেহারা এই দম্পতি।

ক্ষতিগ্রস্ত তোফাজ্জল হোসেন ওই গ্রামের মৃত জহির উদ্দিনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করে আসছেন তিনি। জীবিকার তাগিদে রিকশা চালিয়ে সংসার চালান তোফাজ্জল। তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমও ঢাকায় অন্যের বাসায় কাজ করতেন। কঠোর পরিশ্রম করে সংসারের খরচ মেটানোর পর যা কিছু অবশিষ্ট থাকত, সেখান থেকেই অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন তারা।

স্বামী-স্ত্রীর এই দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের পেছনে ছিল একটি স্বপ্ন, বৃদ্ধ বয়সে যেন অন্যের কাছে হাত পাততে না হয়। ভবিষ্যতে গ্রামের বাড়িতে কিছু জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ কিংবা অন্য কোনো কাজে লাগিয়ে জীবনের শেষ সময়টা একটু স্বস্তিতে কাটাবেন। তাদের রয়েছে তিন কন্যাসন্তান। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা পরিকল্পনা ছিল এই দম্পতির।

সম্প্রতি ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন তোফাজ্জল হোসেন ও তার স্ত্রী। তাদের পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘদিনের জমানো টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নেওয়া। সেই উদ্দেশ্যে ঘরে রাখা সঞ্চয়ের বাক্সটি খুলে টাকা বের করতে যান তারা।

কিন্তু বাক্স খুলতেই তাদের চোখ কপালে ওঠে। দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের প্রায় পুরো টাকাই উইপোকা কেটে নষ্ট করে ফেলেছে। কোথাও নোটের অংশবিশেষ, কোথাও আবার ছোট ছোট কাগজের টুকরো, এমন দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন তারা।

যে টাকা নিয়ে তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই টাকাই মুহূর্তে তাদের কাছে পরিণত হয়েছে মূল্যহীন কাগজের টুকরোয়। দীর্ঘ বছরের শ্রম, ঘাম ও ত্যাগের সঞ্চয় এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেনের মতো একজন শ্রমজীবী মানুষের জন্য ২ লাখ টাকা জমানো সহজ বিষয় নয়। ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনে রিকশা চালিয়ে উপার্জন করা অর্থ থেকে সংসারের খরচ চালিয়ে সামান্য সামান্য করে টাকা জমিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে তার স্ত্রীও গার্মেন্টসে শ্রম দিয়ে সংসারের সচ্ছলতার জন্য অবদান রেখেছেন।

এভাবেই বছরের পর বছর কষ্ট করে তারা সঞ্চয় গড়ে তুলেছিলেন। সেই অর্থ নিরাপদ মনে করে ঘরের একটি বাক্সে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বাক্সে থাকা টাকায় উইপোকা ধরায় তাদের সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে চুরমার।

সঞ্চয়ের টাকা হারানোর পর পরিবারটির সামনে এখন দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। যে টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, তা আর নেই। নতুন করে এত টাকা জমানোও তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

তিন কন্যার এই পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর শ্রমই ছিল আয়ের প্রধান অবলম্বন। জীবনের একটি বড় সময় কষ্ট করে অর্থ সঞ্চয় করার পর শেষ মুহূর্তে সেই অর্থ হারিয়ে পরিবারটি যেন একেবারে শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়রা রানা মিয়াসহ আরও জানান, তোফাজ্জল হোসেন ও ফাতেমা বেগমের মতো শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই অর্থের মূল্য অনেক বেশি। তাদের দীর্ঘদিনের কষ্টের সঞ্চয় এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিবারটির পাশে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ দাঁড়ালে তারা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন।

দীর্ঘ ১০-১২ বছরের কষ্টে জমানো অর্থ হারিয়ে বর্তমানে তোফাজ্জল হোসেন ও ফাতেমা বেগম দিশেহারা। তাদের পরিকল্পনা ছিল সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি অবলম্বন তৈরি করা। কিন্তু সেই পরিকল্পনা এখন ভেস্তে গেছে।

শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে পরিবারটির চোখে-মুখে এখন শুধুই হতাশা। তাদের করুণ অবস্থায় স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যেও নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত এই শ্রমজীবী পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সহৃদয় মানুষের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

দীর্ঘদিনের শ্রমে তিলে তিলে গড়ে তোলা একটি পরিবারের স্বপ্ন এভাবেই উইপোকার ক্ষুধায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।