ইয়ানূর রহমান : প্রখর রোদের তাপ মাথায় নিয়ে সীমান্তের মাঠে বসে আছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। কারও মুখে ক্লান্তির ছাপ, কারও চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। খাবার ও পানির সংকটে দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। কাঁটাতারের দুই পাশে দুই দেশের অবস্থানগত টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে পড়া এসব মানুষের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।
যশোরের বেনাপোল সীমান্তের সাদিপুর-রঘুনাথপুর এলাকায় প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে ১০ থেকে ১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশু অবস্থান করছেন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাংলাদেশে জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালালেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত শনিবার দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে বিএসএফ তাদের অংশের কাঁটাতারের গেট খুলে ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর উদ্যোগ নেয়। তবে বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দিলে তারা সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে দিন-রাত সীমান্তেই কাটছে তাদের।
মঙ্গলবার দুপুরেও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নারী-শিশুসহ দলটি সীমান্তের মাঠে বসে আছে। প্রচণ্ড রোদ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মানবিক এই পরিস্থিতি নিয়ে এলাকাজুড়ে আলোচনা চলছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রটোকল লঙ্ঘন করে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি নাগরিক হলে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এবং দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে তাদের গ্রহণ করা হবে। অবৈধভাবে পুশ-ইনের কোনো সুযোগ নেই।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মঙ্গলবার (২ জুন) বেলা ১২টার দিকে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তিনি দেননি।
এর আগে সোমবার (১ জুন) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান ঘটনাস্থল পরিদর্শণ শেষে সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে বিএসএফের কাছে দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং দুই বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি।
এদিকে সীমান্তের রঘুনাথপুর-সাদিপুর এলাকায় শত শত উৎসুক মানুষ ভিড় করছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজিবি সদস্যরা সীমান্ত এলাকায় বাঙ্কার খনন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছেন এবং সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
সীমান্তের কাঁটাতারের পাশে বসে থাকা এসব মানুষের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্নের উত্তর হয়তো তদন্তে মিলবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের চোখে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-অনিশ্চয়তার এই অপেক্ষার শেষ কোথায়, আর আগামী রাতটি তারা কাটাবেন কোথায়?
