ফেলে আসা দিনগুলো- ৭০

এবাদত আলী

আমাদের আনন্দ ভ্রমণের চতুর্থ দিন অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি চট্রগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটি যাত্রা। কোচ ছুটে চলেছে রাঙ্গামাটির পথে। একসময় পাহাড় ঘেরা অরণ্যের মাঝে ঘাগরা ডাকবাংলোর নিকট পৌঁছলাম। এখানে সামান্য সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি। উদ্দেশ্য ঘাগরা ডাকবাংলো পরিদর্শন করা। উঁচু পাহাড়িয়া রাস্তা থেকে প্রায় তিন’শ ফুট উপরে ডাকবাংলোটি অবস্থিত। উপরে উঠার জন্য ধাপে ধাপে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। উপরে উঠে নিচের দিকে দৃষ্টি দিতেই আমাদের কোচটিকে একটি খেলনা গাড়ি বলে মনে হতে লাগলো। সেখান থেকে পাহাড়ের তলদশের দৃশ্য আরো মোহনীয়। নিচের বাইদে অর্থাৎ ঝরণার পানিতে এক মা তার সন্তানকে গোসল করাচ্ছে। তা দেখে মনে হলো যেন একটি বড় পুতুল একটি
ছোট পুতুলের সাথে খেলা করছে। এখান থেকে দুরের পাহাড় এবং পাহাড়ের চুড়া অস্পষ্ট। কুয়াশাবৃত থাকায় বেশিদুর দৃষ্টি দেয়া যায়না। কিন্তু নিকটের পাহাড় এবং পাহাড়ের চুড়ার নানা বৃক্ষরাজি দেখলে সত্যি প্রাণ জুড়ায়। শ্যামল লতা পাতা এবং বিশালকায় গাছপালা গোটা পাহাড়কেই যেন শ্যামললিমা করে রেখেছে। এ জীবনে এভারেষ্ট শৃঙ্গ দেখার বরাত হয়নি বটে তবে এখানে দাঁড়িয়ে বিশাল বিশাল পাহাড়রাজির চুড়া দেখলে দুচোখ জুড়িয়ে যায়। সত্যিই এহেন স্মৃতি কি কখনো ভুলা যায়?
ডাকবাংলোর পাশেই নিচের পাহাড়ের কোলে ঘাগরা বিডিআর ক্যাম্প। এখান থেকে অতি অল্প দুরে পাহাড়ের সুড়ঙ্গের মাঝে একটি বাজার আছে। আর সেই বাজারে ভারতের মিজোরাম প্রদেশের সীমান্ত পথে আসা হরেক কিছিমের চোরাচালানী দ্রব্যাদি অপেক্ষাকৃত কম মুল্যে পাওয়া যায়। আমাদের কারো দৃষ্টিই সেদিকে ছিলোনা কারণ আমরা পাহাড় দেখতে দেখতে সবাই অভিভুত হয়ে পড়েছিলাম।
পাহাড়ের চুড়া থেকে নেমে আবার পাহাড়ের পথ বেয়েই আমাদের চলা। পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে সরু পাকা রাস্তা। এঁকে বেঁকে চলে গেছে এ পাহাড় থেকে ওপাহাড়ে। পাহাড়ের যেন শেষ নেই। এই পাহাড়িয়া পথে যানবাহন চলাচল খুবাই কম। চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটি এবং রাঙ্গামাটি থেকে চট্টগ্রামের পথে খুবই স্বপ্পসংখ্যক বাস চলাচল করে। লোকাল বাস গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগে দু থেকে আড়াই ঘন্টা। কিছুসংখ্যক ট্রাকও চলাচল করে থাকে। তবে বেশিরভাগ ট্রাকেই থাকে অবৈধ কাঠ বোঝাই করা। এসব কাঠ বোঝাই ট্রাক বিডিআর কিংবা প্রহরারত পুলিশ বাহিনীর সামনে দিয়ে অবাধে চলে যায়। রাঙ্গামাটি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় শতাধিক ইট ভাটা রয়েছে। ঐসকল ইট ভাটাতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানো হয়।
কিছুদুর যাবার পর হোটেল গোল্ডেন হিল এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের নির্মানাধীন উপকেন্দ্র। পাশেই বাংলাদেশ বেতারের রাঙ্গামাটি কেন্দ্র। একসময় রাঙ্গামাটি পৌরসভা এলাকায় পৌঁছলে পৌরসভায় প্রবেশের জন্য ৫০ টাকা ফি আদায় করা হলো। আমরা আমাদের কল্পনার রাজ্য পাহাড়িয়া শহর রাঙ্গামাটি পৌঁছে গেলাম। শহরটি বেশ ছিমছাম। তেমন কোলাহল নেই। কালো ধুঁয়া নেই। কোন যানজটেরও বালাই নেই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে রাঙ্গামাটি এমনি একটি শহর যেখানে কোথাও একখানা রিকসা খুঁজে পাওয়া যাবেনা। অর্থাৎ রাঙ্গামাটি রিকসাবিহীন শহর। তবে বেশ কিছু বেবিট্যাক্সি রয়েছে। গোঁ গোঁ শব্দ করে মসৃন ঢালু রাস্তা বেয়ে নিচের দিকে নামছে আবার পাহাড়ের উচুতে উঠে যাচ্ছে। উদার ও শান্ত প্রকৃতির মানুষগুলো রাস্তার একপাশ দিয়ে সুশৃংখলভাবে হেঁটে যায়। শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর সত্যি সত্যিই তাদের গায়ে শান্তির সুবাতাস লেগেছে যেন। তাই এ শহর আর কিছুতেই উত্তপ্ত হয়না। গুলির শব্দও তাদের কানে আর বাজেনা। বোমা ফাটার শব্দে তারা আর সচকিত হয়না। এসব নিয়ে হয়তো তাদের আর কোন দুশ্চিন্তা নেই। কিছু দুর যাবার পর রাঙ্গামাটি স্টেডিয়াম পাওয়া গেল। স্টেডিয়ামটির নাম এম এ আলী স্টেডিয়াম। পাশেই পাহাড়ের উপর শহীদদের কবর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁরা সেখানে চিরন্দ্রিায় শায়িত আছে। তারই নিচে পাহাড় কেটে সমতল ভূমিতে নির্মাান করা হয়েছে স্টেডিয়াম। জানা গেল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এম এ আলী নামক এক ব্যক্তি রাঙ্গামাটি মহকুমা এসডিও থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। কর্নফুলি নদীর তীর ঘেঁষে বিশাল হ্রদের পাশেই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। পাশেই রয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।
রহমত আলী নামক জনৈক যুবকের নিকট থেকে বিস্তারিত জেনে নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। রাঙ্গামাটি পর্যটন কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামের পাশে গাছের নিচে কোচ থামানো হলো। যে যার মত পায়ে হেঁটে ছুটলো মূল পর্যটন কেন্দ্রের দিকে। সামনেই পাহাড়ের টিলার উপর বিশাল পর্যটন মোটেল। বেশ ছিমছাম মোটেল। দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিঁড়ে ঠাসা। মোটেল পেরিয়ে সমতল ভূমি। এখানে রয়েছে বেশ কিছু বার্মিজ সপ। বার্মার যুবতি মেয়েরা অবাধে দোকানে বেচাকেনা করছে। পাশেই টিকেট কাউন্টার। জনপ্রতি দুটাকা দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করে পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হয়। আমরা টিকেট নিয়ে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। সরু পাকা রাস্তা বেয়ে কিছুদুর যাবার পর ঝুলন্ত সেতু। পর্যটকদের মন মাতিয়ে তোলার জন্য কাপ্তাই হ্রদের উপর এই ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। কর্ণফুলির বিস্তির্ণ জলরাশি। জলে ঘেরা সারি সারি পাহাড়। প্রাকৃতিক অপূর্ব সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতুর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে বেড়াতে মনে শিহরণ জাগে। এমনি রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে আমরা সেতু পার হয়ে ওপারের খাড়া পাহাড়ে গিয়ে উঠলাম। প্রায় চার’শ বর্গমাইল জুড়ে অবস্থিত বিশাল হ্রদের পাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য নিচে হ্রদের পাড়ে রয়েছে স্পিড বোট এবং ইঞ্জিন চালিত নৌকা। ঘন্টা প্রতি দু’শ টাকার চুক্তিতে আমরা স্পিড বোট ভাড়া করলাম। হ্রদের মাঝে ভেসে বেড়িয়ে হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি দিয়ে উপভোগ করলাম রাঙ্গামাটির অনিন্দ সুন্দর নিসর্গ প্রকৃতিকে। যে প্রকৃতিতে নির্মল বায়ূ প্রবাহিত হয়। হ্রদের জলরাশিতে বিস্তীর্ণ পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি পড়ে মোহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। দুর পাহাড়ের চুড়ায় মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলা। এসব দেখে মনে হয় “ স্বার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।”
এদিকে ক্ষুধার জালায় পেট তখন জ্বলতে শুরু করেছে। তাড়াহুড়ো করে ফিরে গিয়ে শহরের একটি হোটেলে খাবার পর্ব সমাধা করা হলো।
এবার ফেরার পালা। সকলে কোচে উঠে বসতেই কোচ ছেড়ে দিলো। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ০২/০৬/২০২৬.