এবাদত আলী
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) কর্তৃক সাংবাদিকতায় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে বিগত ১২ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর ২০১০ খ্রিঃ পর্যন্ত তিন দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালায়
পিআইবির প্রশিক্ষক মো: আব্দুল মান্নানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন পিআইবির সিনিয়র প্রশিক্ষক আ স ম আব্দুল হক, পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সম্পাদক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ শিবজিত নাগ ও পেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক উৎপল মির্জা।
এরপর প্রথম কর্মদিবসে পরিচিতি পর্ব শেষে ‘সাংবাদিকতা ও রূপকল্প-২০২১’ বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন পিআইবির মহাপরিচালক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস। দেশ গঠন নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন তিনি। পাল রাজত্ব থেকে হিন্দু, মুসলমান ও ইংরেজ উপনিবেশ কাল স্মরণ করে তিনি নদীর গতিপথেরও বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, বর্তমান মহাজোট তথা আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ রূপকল্প ঘোষণা করেছে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এই রূপকল্পের কথা বলা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। এই যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ রক্ত দিয়েছে, প্রায় ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এই দেশকে সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সে সপ্ন সফল হয়নি। আজ তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত ¡গ্রহণের পর ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টি ওয়ান রূপকল্পের ঘোষণা দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোকে আগামি ২০২১ সালে এই দেশ ৫০ বছরে পদার্পন করবে। ২০২১ সালের মধ্যে তাই এই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে সবাইকে নিঃসার্থভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরো বলেন,বাংলাদেশ সরকারের অর্থ আছে, বিদেশী সাহায্য সহজেই পাওয়া যায়, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় এ দেশ উন্নতির শিখরে উঠতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাংবাদিকগণ তাঁদের লেখনির মাধ্যমে মানুষের আকাংখা পূরণে সহযোগির ভুমিকা পলন করতে সক্ষম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দিনবদলের কর্মসূচি হাতে নিয়ে ডিজিটাল বংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এতে সাংবাদিকগণ সহায়ক শক্তি হসাবে দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পুরণের বিষয়ে লেখনির মাধ্যমে সমাজকে সচেতন করতে পারেন। ব্যক্তির জ্ঞানের পরিবর্তনের মাধ্যমে সমষ্টির জ্ঞানের পরিবর্তন আনা সম্ভব। তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞানসমাজ তৈরি করে তথ্য জ্ঞান সমাজের মাঝে সিড়ি তৈরি করতে সক্ষম। এই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকগণ সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। এক্ষেত্রে সাংবাদিকগণ শিক্ষকের ভুমিকা পালন করতে পারে। মহাপরিচালক আরও বলেন, বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই দেশের ৪শ ৬১ টি ইউনিয়নে তথ্যকেন্দ্র চালু করেছে। যার মাধ্যমে দিনবদলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি গ্রামীণ জনপদের খবরাখবর বেশি বেশি গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের শেষপর্যায়ে সাংবাদিক আঁখিনুর ইসলাম রেমনের এক প্রশ্নের জবাবে বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁর কারাবরণ প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করেন। সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেফতারের প্রতিবাদ করায় এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দু নেত্রীর মুক্তির দাবি করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর রোষানলে পড়েন তিনি এবং তাঁর অপর দুজন সহকর্মী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন ও সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল¬াহ আল মামুন। তিনি তখন ছিলেন রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। ২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁদেরকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর পিআইবির প্রশিক্ষক আব্দুল মান্নান সংবাদ, সংবাদের উপাদান, সংবাদ মুল্য ও সংবাদ চেতনা বিষয়ক আলোচনা করেন। পিআইবির সিনিয়র প্রশিক্ষক আসম আব্দুল হক সংবাদ সুচনা ও সংবাদ কাঠামো (ব্যবহারিকসহ) প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে রিপোর্ট লেখার কলাকৌশল, সংবাদের নীতিমালা ও অনলাইন জার্নালিজম বিষয়ক আলোচনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড.প্রদীপ কুমার পান্ডে। অনলাইন সাংবাদিকতা বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি ১৯৮০ সাল থেকে কম্পিউটারের পদযাত্রার কথা উল্লে¬খ করেন। ১৯৯২ সালে আমেরিকার শিকাগো থেকে এর বিকাশ ঘটে এবং ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর এর ব্যাপকতা ও চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে বলে জানান। তিনি বলেন, অনলাইনের মাধ্যমে সাংবাদিকতার পার্থক্য শুধু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে। অন্য মিডিয়ার চেয়ে অনলাইনে পরিসরের ব্যপ্তি ঘটানো সম্ভব। এতে সংবাদের অডিও ভিজ্যুয়াল উপস্থানা সম্ভবপর বটে। এদিন আলোচনায় আরো অংশগ্রহণ করেন পিআইবির সিনিয়র প্রশিক্ষক আ স ম আব্দুল হক ও প্রক্ষিক আব্দুল মান্নান।
১৪ ডিসেম্বর ছিল এই কর্মশালার সমাপ্তির দিন। এদিন ফিচার লেখার কলাকৌশল, সংবাদের ভাষ্য ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা, সাক্ষাৎকার, প্রেস কন্ফারেন্স ও প্রেস ব্রিফিং ইত্যাদি বিষয়ভিত্তিক আলোচনার পর প্রশিক্ষনার্থীদের মাঝে সনদ বিতরণ উপলক্ষে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি রুমী খোন্দকারের সভাপতিত্বে উক্ত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন ও সনদ প্রদান করেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোজাফ্ফর হোসেন।
এসময় পিআইবর সিনিয় প্রশিক্ষক আস ম আব্দুল হক, প্রশিক্ষক আব্দুল মান্নান ও পাবনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক উৎপল মির্জা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে মধ্যাহ্ন ভোজের পর আমরা কর্মশালা থেকে বিদায় নিলাম।(ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ:২২ /০৯/২০২৫.
