হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহে অটো রাইস মিলের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি এবং হাসকিং মিলের অনুকূলে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে সনাতন পদ্ধতির হাসকিং মিল ও চাতাল। ব্যাংকঋণের বোঝা, পুঁজির সংকট ও ব্যবসায়িক মন্দায় অনেক মিল মালিকও পড়েছেন চরম বিপাকে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো নারী-পুরুষ শ্রমিক। জীবিকার তাগিদে কেউ অটোভ্যান চালাচ্ছেন, আবার কেউ অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২০টি হাসকিং মিল ছিল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৩৫টি। একসময় এসব মিল থেকে প্রাপ্যতা অনুযায়ী সরকারি খাদ্যগুদামে ধান ও চাল সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে হাসকিং মিল থেকে চাল সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম বলে অভিযোগ মিল মালিকদের।
মিল মালিকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় অটো রাইস মিলের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে গত ছয় বছর ধরে সুন্দরগঞ্জে অটো রাইস মিল চালু হওয়ার পর খাদ্য অধিদপ্তরের চাহিদার বড় অংশ এসব মিল থেকে পূরণ করা হচ্ছে। ফলে হাসকিং মিল মালিকরা পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, ব্যাংকঋণ পরিশোধ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও পুঁজির সংকটে অনেক মালিক ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
মিল মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট বছর ধরে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুরুতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের তালিকা এবং পরে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এ পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কয়েকজন মিল মালিকের অভিযোগ, বাস্তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব থাকায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসকিং মিল মালিক এমদাদুল হক বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের কারণে অধিকাংশ মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে ব্যাংকের দায়দেনা ও পুঁজির সংকট যুক্ত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অটো মিল মালিকদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ করা হলেও হাসকিং মিল মালিকরা পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাচ্ছেন না। অথচ ১৫ বছর আগেও হাসকিং মিল থেকে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান ও চাল সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে মিল ও চাতালের অবকাঠামো নিয়েও মালিকরা বিপাকে রয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের ওপরও। কাজ হারিয়ে হাজারো নারী-পুরুষ বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন।
চাতাল শ্রমিক নুর মোহাম্মদ বলেন, প্রায় ১৫ বছর চাতালে কাজ করেছি। হঠাৎ মালিক মিল বন্ধ করে দেওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়ি। কোনো উপায় না পেয়ে এখন অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি।
নারী শ্রমিক মোছা. উপরানী বেগম বলেন, মিল বন্ধ হওয়ার পর মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোমতে বেঁচে আছি। মিলে কাজ করার সময় সংসার ভালোভাবেই চলত। এখন অনেক কষ্ট করে দিন কাটাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, উপজেলার গোপ-এ্যাগ্রো লিমিটেড অটো রাইস মিলের মালিক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবছর খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করেন তাঁরা। হাসকিং মিল মালিকদের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই।
তারাপুর ইউনিয়নের হক চাল ও নাজমা চালকলের মালিক শামসুল হক বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি সরকারি কোনো বরাদ্দ পাননি। ব্যবসা না থাকায় ব্যাংকে তাঁর ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে। তাঁর অভিযোগ, সব জায়গায় সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। বরাদ্দ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকেও চাতাল বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
উপজেলা চাতাল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. শাহাদৎ হোসেন আনন্দ বলেন, সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় অনেক চাতাল ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে গেছেন। বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের কারণে অনেক ব্যবসায়ী চাতাল বন্ধ করে দিয়েছেন। এ অবস্থায় হাসকিং মিল ও চাতালশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক স্বপন কুমার দে বলেন, নিয়ম মেনে কৃষকরা ধান সরবরাহ করতে পারেন না। তারপরও সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি কৌশল রয়েছে। হাসকিং মিল মালিকরা বর্তমানে চাল সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে যেসব মিল চালু রয়েছে, সেগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসকিং মিল ও চাতালশিল্পের সঙ্গে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহে বরাদ্দ বণ্টনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, চালু মিলগুলোর সক্ষমতা যাচাই এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় দীর্ঘদিনের এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত আরও অনেক পরিবার জীবিকার সংকটে পড়তে পারে।
