মশাহিদ আহমদ, মৌলভীবাজার : সরকারি চাকরি থেকে চ‚ড়ান্তভাবে বরখাস্ত হওয়ার প্রায় সাত বছর পর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির পরিচালক পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন রামকান্ত সিংহ। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে বিভাগীয় মামলা, সরকারি অর্থসংক্রান্ত অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরবর্তীতে সরকারি চাকরি থেকে চ‚ড়ান্ত বরখাস্তের নথি থাকার পরও একই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপ‚র্ণ পদে পুনরায় নিয়োগ পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার গত ১৩ আগস্ট-২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এর ১১(১) ও ১১(২) ধারা অনুযায়ী রামকান্ত সিংহকে মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির পরিচালক পদে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পর্যালোচনায় তাঁর চাকরিজীবন নিয়ে ভিন্ন একটি তথ্য উঠে এসেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রামকান্ত সিংহের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থসংক্রান্ত অনিয়ম, অসদাচরণ, নিয়মবহির্ভ‚ত কার্যক্রম, দাপ্তরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন না করা এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নং-০১/২০১৭, তারিখ ২২ মে-২০১৭ দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ৬ নভেম্বর ২০১৭ তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিভাগীয় তদন্ত ও পরবর্তী কার্যক্রম শেষে বিগত ২০১৯ সালের ১৩ জুন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে রামকান্ত সিংহকে সরকারি চাকরি থেকে চ‚ড়ান্তভাবে বরখাস্ত (উরংসরংংধষ ভৎড়স ংবৎারপব) করা হয়।
এদিকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশের পর চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে তিনি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-৩-এ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ বিষয়ে এ.টি. মামলা নং-৪০৯/২০১৯ দায়ের করা হয় এবং পরবর্তীতে মামলা নং-৭১/২০২১-এর মামলার তথ্যও পাওয়া যায়। তাহলে কী প্রক্রিয়ায় পুনঃনিয়োগ ? এখানেই ম‚ল প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, একজন ব্যক্তি যখন সরকারি চাকরি থেকে চ‚ড়ান্তভাবে বরখাস্ত, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রমের নথি রয়েছে এবং চাকরিতে পুনর্বহালের জন্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা চলমান থাকার তথ্য রয়েছে, তখন কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁকে আবারও একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলো ? এ নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর প‚র্বের চাকরির ইতিহাস, বিভাগীয় মামলার ফলাফল এবং সরকারি চাকরি থেকে চ‚ড়ান্ত বরখাস্তের বিষয়টি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিয়েছে কি না ? সেটিও এখন গুরুত্বপ‚র্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার বর্তমান অবস্থা কী এবং মামলাটির নিষ্পত্তি না হয়ে থাকলে সেটি নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কি না। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০-এর যে ধারার অধীনে তাঁকে পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেই ধারায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর প‚র্বের সরকারি চাকরি থেকে চ‚ড়ান্ত বরখাস্তের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয় এ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে। স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন : সংশ্লিষ্টদের মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলেও সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর অতীত চাকরির রেকর্ড, বিভাগীয় শাস্তি এবং আদালত বা ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তাই চ‚ড়ান্ত বরখাস্তের প্রায় সাত বছর পর কীভাবে একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হলো, নিয়োগের আগে তাঁর চাকরির রেকর্ড ও বিভাগীয় মামলার তথ্য যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের মামলার বিষয়টি নিয়োগ কর্তৃপক্ষ কীভাবে বিবেচনা করেছে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের মামলার বর্তমান অবস্থাও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
