নিজস্ব প্রতিবেদক, করিমগঞ্জ:
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া আব্দুল হেকিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রকাশ্যে প্রাইভেট বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার মতো আশঙ্কাজনক তথ্যও মিলেছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।
অনুসন্ধানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৮টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে আছে। তাদের মধ্যে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, প্রতি মাসে ৪০০ টাকা বেতনে ওমর ফারুক কাঞ্চন, আব্দুল আউয়াল এবং হযরত আলী তাদের প্রাইভেট পড়ান। নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিকেলে পড়ানো হয়। প্রতিদিন সকাল ৮টায় ওমর ফারুক কাঞ্চন ও ৯টা থেকে আব্দুল আউয়াল ক্লাস নেন; অন্য সময়ে পড়ান হযরত আলী। বিদ্যালয়টির সীমানা প্রাচীর না থাকায় প্রাঙ্গণে বহিরাগত বখাটেদের আড্ডা দিতে দেখা গেলেও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা সটকে পড়ে। পরে শিক্ষক নিজেই এসে শ্রেণিকক্ষের তালা খুলে শিক্ষার্থীদের ভেতরে নিয়ে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন।
শুধু তা-ই নয়, সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ কয়েকজন শিক্ষার্থী—রিফাত, সাজিম ও জেরিন অভিযোগ করে জানায়, শিক্ষক আব্দুল আউয়ালের কাছে প্রাইভেট না পড়লে টেস্ট (নির্বাচনী) পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখানো হতো। বাধ্য হয়ে অনেককেই টাকা দিয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক ওমর ফারুক কাঞ্চন দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পরিচালনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের নির্দেশেই দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। অথচ উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাথীসহ রোল ১০-এর ভেতরের ৪ জন এবং নবম-দশম শ্রেণির ৭-৮ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়—যা দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ ক্লাসের দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।
আরেক শিক্ষক আব্দুল আউয়াল দাবি করেন, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে এবং অভিভাবকদের লিখিত আবেদনে এই ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিভাবকদের নামে জমা দেওয়া ওই আবেদনপত্রে নানা গরমিল পরিলক্ষিত হয়।
অন্য দিকে স্কুলর সময় সকাল ১০ টা বাজলেও তুলা হয়নি জাতীয় পতাকাও।
অভিভাবকদের অভিযোগ, দুর্বল শিক্ষার্থীদের পাঠদানের অজুহাতে শিক্ষকরা মূলত কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই স্কুল ত্যাগ করছেন। এক শিক্ষকের অনিয়মের বিরুদ্ধে ৬ মাস আগে প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রায় লক্ষাধিক টাকা মূল্যের একটি গাছ দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হলেও তা সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ ফকির মুঠোফোনে জানান, সরকারি নীতিমালা মেনেই বিশেষ ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। তিনি নীতিমালার কাগজপত্র ও নথিপত্র দেখাতে বিদ্যালয়ে আসার কথা বললেও পরবর্তীতে আর আসেননি।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম তুহিন বলেন, “বিশেষ ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি আমি জানি, তবে এর বিস্তারিত প্রধান শিক্ষকই বলতে পারবেন। আমি কমিটিতে নতুন এসেছি; গাছ নষ্ট হওয়া, প্রাইভেটের নামে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করা ও বখাটেদের উৎপাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
বিষয়টি নিয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের সাথে মোবাইলে কয়েকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে অন্য স্কুলের একজন শিক্ষক বলেন,মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, হাইস্কুলে বা মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) বিশেষ ক্লাসের নামে শিক্ষার্থীদের কোচিং করানো বা ফি নিয়ে কোচিংয়ে বাধ্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
