নির্ভীক কলম সৈনিক মীর্জা শামসুল ইসলাম: পাবনার সাংবাদিকতার এক স্মরণীয় অধ্যায় : আজ ২৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী

।। এবিএম ফজলুর রহমান।।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কর্মের রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন। সময়ের স্রোত তাঁদের শরীরকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, কিন্তু তাঁদের কাজ, তাঁদের চিন্তা এবং মানুষের জন্য করা তাঁদের অবদান তাঁদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। পাবনার সাংবাদিকতার ইতিহাসে মীর্জা শামসুল ইসলাম তেমনই এক স্মরণীয় নাম।
আজকের ৩ অক্টোবর তার ২৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী। উপলক্ষে পাবনা প্রেসক্লাব শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে আয়োজন করেছে।

মির্জা শামসুল ইসলাম ছিলেন সাংবাদিক, সংগঠক এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ। তাঁর সাংবাদিকতার মূল শক্তি ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। সংবাদকে তিনি কেবল ঘটনা হিসেবে দেখেননি; বরং সেই ঘটনার অন্তরালে থাকা মানুষ, তাঁর দুঃখ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই তাঁর সাংবাদিকতা আজও আলাদাভাবে স্মরণ করার দাবি রাখে।

সাংবাদিকতার সঙ্গে নিবিড় পথচলা
মীর্জা শামসুল ইসলামের কর্মজীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে সাংবাদিকতায়। তিনি অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার পাবনা স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পাবনা স্টাফ রিপোর্টার হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকতা আজকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, লেখা এবং তা গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া—প্রতিটি কাজেই প্রয়োজন হতো সময়, শ্রম, ধৈর্য ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের। এই বাস্তবতার মধ্যেই তিনি পাবনা ও আশপাশের মানুষের জীবন ও জনপদের নানা ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

তাঁর প্রতিবেদনে স্থানীয় মানুষের কথা গুরুত্ব পেত। মানুষের পক্ষে লেখায় যেন তার মূল মন্ত্র। ফলে তিনি শুধু একজন সংবাদদাতা ছিলেন না; হয়ে উঠেছিলেন একটি জনপদের কথক।

নেতৃত্বেও রেখেছেন স্বাক্ষর
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি পাবনা প্রেসক্লাবের দুইবার সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, পাবনা জেলার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

একজন সাংবাদিক সংগঠকের দায়িত্ব কেবল পদ অলংকরণ নয়। সহকর্মীদের পেশাগত স্বার্থ, সাংবাদিকতার মর্যাদা এবং সংগঠনের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তাঁর ওপর বর্তায়। মীর্জা শামসুল ইসলাম সেই দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

তাঁর নেতৃত্বের এই অধ্যায় প্রমাণ করে, সাংবাদিকতা তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত পেশা ছিল না; এটি ছিল একটি সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব।

মানসিক হাসপাতাল নিয়ে সাহসী ধারাবাহিক প্রতিবেদন
মীর্জা শামসুল ইসলামের সাংবাদিকজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল পাবনা মানসিক হাসপাতালকে ঘিরে তাঁর ধারাবাহিক প্রতিবেদন।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে যখন নানা ধরনের কুসংস্কার, ভয় ও নেতিবাচক ধারণা ছিল, তখন মানসিক রোগীদের জীবন, হাসপাতালের বাস্তবতা এবং তাঁদের নানা সমস্যাকে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা সহজ কাজ ছিল না।

কিন্তু তিনি সেই কঠিন বিষয়টিকেই সাংবাদিকতার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

জানা যায়, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে কেন্দ্র করে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রায় দুই শতাধিক প্রতিবেদন করেন। এসব প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে তিনি মানসিক রোগীদের জীবন ও তাঁদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মতো বিষয়কে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন।

এই কাজের গুরুত্ব শুধু প্রতিবেদনের সংখ্যায় নয়; এর আসল গুরুত্ব ছিল বিষয় নির্বাচনে। সমাজ যাদের নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করত, তিনি তাঁদের কথাই সামনে আনতে চেয়েছিলেন।

একজন সাংবাদিকের মানবিকতা কখন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে? সম্ভবত তখনই, যখন তিনি সমাজের সবচেয়ে নীরব মানুষটির কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। মীর্জা শামসুল ইসলামের মানসিক হাসপাতালবিষয়ক সাংবাদিকতা সেই মানবিক সাংবাদিকতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

সাংবাদিকতার বাইরেও কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ততা
মীর্জা শামসুল ইসলামের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃষি। কৃষির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রপতি পদক লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে তাঁর রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক অর্জনের কথা বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন সাংবাদিকের এমন স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট হয়। তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; সমাজ ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কৃষির প্রতিও তাঁর আগ্রহ ও অবদান ছিল।

মানুষের পাশে দাঁড়ানো সাংবাদিকতা
মীর্জা শামসুল ইসলামের সাংবাদিকতার দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে—মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।

সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় একটি ঘটনা তুলে ধরা আর একটি সমস্যার গভীরে গিয়ে তার মানবিক দিকটি তুলে ধরা এক বিষয় নয়। তাঁর কাজের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে দ্বিতীয় প্রবণতাটিই বেশি স্পষ্ট।

তিনি বুঝেছিলেন, সাংবাদিকতার শক্তি শুধু তথ্য প্রকাশে নয়; সাংবাদিকতা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, অবহেলিত বিষয়কে আলোচনায় আনতে পারে এবং সমাজকে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।

এই বিশ্বাস থেকেই হয়তো তিনি পাবনা মানসিক হাসপাতালের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রতিবেদন করেছিলেন।

মীর্জা শামসুল ইসলামের সাংবাদিকতা ছিল এমন এক সময়ের সাংবাদিকতা, যখন জেলা শহরের সংবাদকর্মীদের জাতীয় গণমাধ্যমে জায়গা করে নিতে অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে হতো। যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত ছিল, তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগ ছিল অপ্রতুল, আর সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিককে সরাসরি মানুষের কাছে যেতে হতো।

সেই সময় পাবনার মতো একটি জেলা থেকে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত কাজ করা ছিল নিজের জায়গা তৈরি করার একটি কঠিন সংগ্রাম। তিনি সেই পথ পাড়ি দিয়েছেন।

তাঁর কর্মজীবন তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি পাবনার সাংবাদিকতার বিকাশের ইতিহাসেরও একটি অংশ।

১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর মীর্জা শামসুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ কখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।

একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ কোনো ভবন বা ফলক নয়—তাঁর লেখা, তাঁর প্রতিবেদন এবং তিনি যে প্রশ্নগুলো সমাজের সামনে রেখে যান, সেগুলোই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার।

মীর্জা শামসুল ইসলাম তাঁর সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, যেগুলোর গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়েছে—সমাজের অবহেলিত মানুষের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী? মানসিক রোগীদের আমরা কীভাবে দেখি? স্থানীয় মানুষের সমস্যা জাতীয় পরিসরে কীভাবে তুলে ধরা যায়? একজন সাংবাদিকের সামাজিক দায় কতটা গভীর হওয়া উচিত?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তাঁর কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকাতেই হয়।

উত্তর প্রজন্মের জন্য প্রেরণা
আজ সাংবাদিকতা প্রযুক্তির অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদ এখন মুহূর্তের মধ্যে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু প্রযুক্তি বদলালেও সাংবাদিকতার মূল মূল্যবোধ বদলায়নি—সত্য অনুসন্ধান, তথ্যের নির্ভুলতা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া।

এই জায়গাতেই মীর্জা শামসুল ইসলামের জীবন আজও প্রাসঙ্গিক।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, সাংবাদিকতার আসল শক্তি শুধু দ্রুত সংবাদ দেওয়ার মধ্যে নয়; বরং এমন সত্যকে সামনে আনার মধ্যে, যা হয়তো অন্যরা এড়িয়ে যাচ্ছে।

পাবনার সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাই মীর্জা শামসুল ইসলাম একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর কলম ছিল মানুষের জন্য, তাঁর সাংবাদিকতা ছিল সমাজের জন্য এবং তাঁর কর্মজীবন ছিল একটি জনপদের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

সময় তাঁকে আমাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর কর্মের স্মৃতি এখনো বলে—সত্যিকারের সাংবাদিকতা কখনো কেবল সংবাদ হয়ে থাকে না; তা একসময় ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। তার ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী জানাই শ্রদ্ধা।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব স্টাফ রিপোর্টার দৈনিক সমকাল, পাবনা।

এবিএম ফজলুর রহমান
সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব
ও
স্টাফ রিপোর্টার দৈনিক সমকাল, পাবনা।