জসীমউদ্দিন ইতি, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
একসময় নাট্যমঞ্চে উঠতেন তিনি, করতেন মননশীল অভিনয়। ব্যাকমঞ্চ থেকে শুরু করে সামনের সারির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যার ছিল প্রাণবন্ত উপস্থিতি। ছাত্রজীবনের প্রারম্ভেই রাজনীতির উত্তাল স্রোতে পা রাখা, এরপর শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকতা, স্থানীয় সরকারের পৌরসভার চেয়ারম্যান, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্য, সরকারের প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় রাজনীতির দূরদর্শী মুখপাত্র এবং সর্বশেষে দলের মহাসচিব।
দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় রাজনীতির অসংখ্য জটিল বাঁক অতিক্রম করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দাঁড়িয়ে আছেন এক ঐতিহাসিক ও নতুন অধ্যায়ের মুখোমুখি। দেশের রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম উঠে আসায় তার প্রিয় জন্মভূমি ও নির্বাচনি এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে অভূতপূর্ব আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। জেলাজুড়ে আনন্দ মিছিল, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং মিষ্টি বিতরণের ধুম পড়েছে।
সংস্কৃতিমনস্কতা ও ছাত্ররাজনীতির সোনালী দিন
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন ওই অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, সমাজসেবক এবং একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকেই শৈশব ও কৈশোরে তিনি সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ হন।
ঢাকা কলেজ থেকে সফলভাবে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনেই তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সমানভাবে বিকশিত হন। নাট্যমঞ্চে নিয়মিত অভিনয় ও নির্দেশনার পাশাপাশি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে রাজপথের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। ষাটের দশকের সেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনই তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিল।
শিক্ষকতা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ
শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জ্ঞানের আলো ছড়াতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি ঢাকা কলেজসহ দেশের একাধিক সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন। সত্তরের দশকের শেষভাগে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে দীর্ঘদিনের প্রিয় শিক্ষকতা পেশা থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি নিয়ে তিনি পুরোপুরি সক্রিয় রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং তৃণমূল মানুষের কাছাকাছি থেকে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ করেন।
এরপর ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগ দেন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও তিনি মাঠপর্যায়ে দলীয় সংগঠন মজবুত করতে কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যান।
সংসদ, মন্ত্রিত্ব এবং রাজপথের নেতৃত্ব
দীর্ঘ পথচলার পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে তৎকালীন বিএনপি সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তাকে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কারণে আসনটি হারালেও জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব দিন দিন বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন এবং গণমাধ্যম ও রাজপথে দলের প্রধান মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।
২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের প্রয়াণের পর চরম প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের গুরুদায়িত্ব পড়ে তার কাঁধে। পরবর্তীতে তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দলের নেতৃত্বের হাল ধরেন এবং কঠিনতম রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটার মধ্যেও দলকে সুসংগঠিত রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
ঠাকুরগাঁওবাসীর গর্ব ও প্রত্যাশার অনুভূতি
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনার শীর্ষে উঠে আসায় ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে বয়ে যাচ্ছে আনন্দধারা। কালিবাড়ি, চৌরাস্তা, গড়েয়াসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জমায়েত হয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করছেন।
সফিকুল ইসলাম (বাসিন্দা, কালিবাড়ি এলাকা):
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন অত্যন্ত সহনশীল, ত্যাগী ও প্রবীণ রাজনীতিক। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যে সম্মান পাচ্ছেন, তা তার দীর্ঘ ত্যাগেরই ফসল। ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান হিসেবে তাকে এই পদে দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য চরম আনন্দের ও গর্বের।
নাজমুল হক (শিক্ষক, গড়েয়া ডিগ্রি কলেজ):
সংস্কৃতি চর্চা, শিক্ষকতা এবং রাজপথের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একজন ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন মির্জা ফখরুল। তিনি আজ বঙ্গভবনের পথে—এটি শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, এটি আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরও একটি বড় অর্জন।
শফিরুল ইসলাম শরিফ (সভাপতি, ঠাকুরগাঁও পৌর বিএনপি):
তৃণমূলের রাজনীতি ও পৌরসভা থেকে উঠে আসা আমাদের কৃতী সন্তান আজ রাষ্ট্রের শীর্ষ ক্ষমতার মুখোমুখি। তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা এক নতুন, সুদৃঢ় ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে দিশা দেখাবে।
মির্জা ফয়সল আমীন (সভাপতি, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপি)
জেলার রাজনীতি থেকে মির্জা ফখরুলের উত্থান। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও অসীম ত্যাগের পর তিনি আজ তার যোগ্য ও প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন। এতে পুরো ঠাকুরগাঁওবাসী আজ উদ্বেলিত। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পেলে তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে অনন্য ভূমিকা রাখবেন।
এক সময়ের উদীয়মান নাট্যকর্মী ও শিক্ষক থেকে আজকের অভিজ্ঞ রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপ্রধানের এই নতুন দায়িত্বে তিনি দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবেন এবং ঠাকুরগাঁওয়ের নাম নতুন করে উঁচুতে তুলে ধরবেন—এমনটাই এখন স্থানীয় আপামর ভরের প্রত্যাশা।
