এবাদত আলী
কবি আমিনুর রহমান খান পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নওয়াগ্রাম নামক গ্রামে ১৯৫৪ সালের ৩০ জুন এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে সাতবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয় হতে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৭৬ সালে অর্থনীতিতে বিএ অনার্স এবং ১৯৭৭ সালে এমএ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি কবিতা এবং গল্প লিখতেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘ স্মৃতির দহন’। এরপর প্রকাশিত হয় ‘ বিপন্ন বিবেক’। ‘ সেই রমণী’ কাব্যগ্রন্থটি কবির তৃতীয় প্রকাশনা। আধুনিক কবিতার ভিড়ের মাঝে বলতে গেলে যখন ছন্দময় কবিতার দেখা পাওয়াই দুস্কর তখন কবি আমিনুর রহমান খানের ছন্দময় কবিতা যেকোন পাঠককে কাছে টানে। মাটি ও মানুষের সঙ্গে রয়েছে কবির নিগূঢ় সম্পর্ক যা তিনি কবিতার মাধ্যেমে অতি সহজ ভাষায় ব্যক্ত করেছেন ‘ ‘আমাদের সেই নওয়াগ্রাম’ কবিতায়। তিনি লিখেছেন, ‘ নওয়াগ্রাম আমাদের প্রিয় সেই নওয়াগ্রাম / যেখানে শৈশব কৈশর পেরিয়ে বড় হলাম। যার আলো হাওয়া গায়ে লাগিয়েছি মোরা সবাই / শরীরে সেই গ্রামের কাদার গন্ধ পাই। যে গ্রামের দোয়েল ঘুঘুর ডাক আজো কানে বাজে / যেখানে নববধুগণ ঘোমটা টেনে দিত লাজে। সেই নওয়াগ্রামে আজ পরিবর্তনের ছোয়া লেগেছে। কবিতার মাঝেই তার ইঙ্গিত মিলেছে, যেমন, বাল্যকালে দেখেছি রাতে গ্রাম হতো নিকষ কালো / বর্তমানে সারা রাত গ্রামে থাকে নিয়নের আলো।’ কবির স্মৃতি মন্থনে রচিত কবিতা ‘ কৈশরে আমি’ কবিতায় তিনি অবলীলায় সত্য কথা লিখেছন যা তার জীবনের কোন না কোন ঘটনার সঙ্গে মিল রয়েছে। যেমন, ‘কৈশরে আমি ভীষণ ডানপিটে ছিলাম / খেলার মাঠে গিয়ে মারপিট করতাম। গ্রামের দস্যি ছেলেরা আমাকে ওস্তাদ মানতো / বিনা বাক্যে মোর হুকুম তামিল করতো। চৈত্র ও বৈশাখ মাসের তপ্ত দুপুরে / দল বেধে সারা গ্রাম বেড়াতাম ঘুরে। কাঁচা আমকুচি লবন দিয়ে মাখাতাম / তার সাথে মরিচ গুঁড়া মিশিয়ে দিতাম, / সব বন্ধু মিলে খেতাম মজা করে / কখনো বকা খেতাম বাবার চোখে পড়ে। পদ্মা নদীতে দল বেধে নাইতাম / কয়েক ঘন্টা ধরে সাাঁতার কাটতাম, বাড়ি ফেরার পথে মোরা বাঙি তুলতাম, / দুতু মন্ডল দেখলে ভোঁ দৌড় দিতাম। ষাট বছরের ঐ বুড়ো দৌড়াতে পারতো / বাঙি খেকো কিশোরদের তাড়া করতো। সে দাবড়ানিতে দিকবিদিক ছুটতাম / কখনো দৌড়ে হয়রান হয়ে যেতাম। খেজুর গাছের আগায় আঠা লাগাতাম / কুলি পাখি আটকে গেলে মোরা ধরতাম। গুলি বাটুল নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরতাম/ ঘুঘু পাখি দেখামাত্রই গুলি করতাম। মধুর স্মৃতি কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘ আজো ভুলতে পারিনে যে তোমায় / দৈবাৎ তোমার কথা মনে হয়। কৈশরে যৌবনের স্মৃতিগুলি কখনো মন মাঝে উঠে উথলি। গ্রামের বকুল গাছটার কাছে / কত শত ঘটনা লুকিয়ে আছে। ভোরে বকুল ফুল কুড়িয়ে নিতে, তা দিয়ে মালা গেঁথে আমাকে দিতে। ‘স্মৃতিতে মতিহার’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, রাজশাহীর মতিহার সবুজ চত্বর / সকল শ্রেণীর মানুষেরই কাড়ে যে নজর। মতিহারের সবুজ চত্বরে মোরা দুজনে / সকাল বিকাল আর সাঁঝে ঘুরেছি আনমনে। আন্দোলনে জোহা স্যার আত্মাহুতি দিয়েছে / তার সমাধি পাশে মোদের কতো সাঁঝ কেটেছে। একত্রে সিনেমা দেখার তুমি ধরতে বায়না / অলোকা হলে ছবি দেখার কথা ভুলা যায়না। পিছনে ফেলে শত সহ¯্র স্মৃতির বহর / ছেড়ে এসেছি মতিহারের মায়াবী চত্বর। প্রকৃতি ও মানবিক আচার আচরণ নিয়ে তিনি এই বইতে বেশ কয়েকটি কবিতা যোগ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চৈত্রের খরতাপ, আষাঢ়ে বৃষ্টির দিনে, শিমুল ফুল, বর্ষণ মুখর দিনে, শাপলা ফুল, প্রেমের সরোবর, অবুঝ স্ত্রী, কুটিজান মেম্বর, হাবুল নামা, টাক বিপত্তি, নাম তার সবিতা, ভালো লাগে, যৌবনের প্রেয়সী, মা, অতীত, বট বৃক্ষের আত্মকথন, সাদা মেঘ, আষাঢ়ে মন চায়, কানা পুকুর, বিল গাজনা ইত্যাদি। বিল গাজনা কবিতায় তিনি লিখেছেন, সুজানগর উপজেলার মাঝেই বিল গাজনা / পূর্ব পশ্চিমে দশ মাইল ব্যাপি আছে যার সীমানা। পূর্ব দিকে রাণীনগর ইউনিয়নের অবস্থান, / পশ্চিমের দুলাইয়ের কয়েকটি গ্রাম বিরাজমান। উত্তরে দুটি ইউনিয়ন আহম্মদপুর ও দুলাই, / দক্ষিন দিকে মানিকহাট এবং হাটখালির ঠাঁই। প্রতি বছর বর্ষকালে বানের জলে বিল ভরে যেতো/ চারিধারসহ সারা বিলেই জলরাশি থৈ থৈ করতো। এখন গাজনার বিল সেই আগের মত আর নাই / আধুনিকতার ছোয়া পেয়ে বদলে গেছে অনেকটাই।
‘পদ্মা চরের মানুষেরা’ কবির একটি অনবদ্য কবিতা। চরাঞ্চলের মানুষেরা সদা-সর্বদাই অতি দুঃখ কষ্টের মাঝে দিনাতিপাত করে থাকে। তারই বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি তার এই কবিতায়। তিনি লিখেছেন, রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া আর পাবনা হয়ে / পদ্মা নদী নিজস্ব গতিতে চলছে বয়ে। যেতে পথে রাজবাড়ি ফরিদপুর গেছে ছুঁয়ে / অবশেষে মেঘনায় মিশেছে চাঁদপুর গিয়ে,/ মাদারীপুর মুন্সিগঞ্জেও দিয়েছে হানা / প্রবল ¯্রােতস্বিনী তা সবার জানা। এই নদীর বুকে আছে বহু বড় বড় চর, / যেথায় হাজার হাজার মানুষ বেঁধেছে ঘর। বিশাল চর গুলোতে বাস করে যে মানুষেরা / প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে তারা। বর্ষাকালে চর অঞ্চল জলে ডুবে যায়, / মানুষ ও গৃহপালিত পশুর দুর্ভোগ হয়। মানুষের চলা ফেরা বেশ বাধগ্রস্থ হয় / নৌকা ছাড়া সব চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কখনো অকাল বন্যায় চৈতালি নষ্ট হয়,/ যার ফলে লোকজন দারুন কষ্ট পোহায়। ঘূর্নি ঝড়ে সাইক্লোনে চরবাসী বিপদে পড়ে, / বাড়ি ঘর বিধ্বস্থ হয় ঐ প্রচন্ড ঝড়ে। আধুনিকতার ছোঁয়া পদ্মার চরে লাগেনি / তেমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। কোন চর অঞ্চলেই বিদ্যুৎ সংযোগ নাই/ রাতে চরের লোকের আধারে কাটে সর্বদাই। কষ্ট সত্বেও বাসিন্দারা চর ছাড়েনা/ পদ্মার চরে বাস করে ভুলে সব বেদনা।
কবি আমিনুর রহমান খান ছিলেন ব্যাংকের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। ১৯৮০ সালে তিনি সরাসরি অফিসার হিসেবে অগ্রণী ব্যাংকে নিয়োগ পান। চাকরিরত অবস্থায় তিনি এমবিএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ২০১২ সালে উচ্চ পদস্থ কর্তকর্ত হিসেবে অবসরে যান। ‘অবসর জীবন’ কবিতায় সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ তিনি তার কবিতায় ব্যক্ত করেছেন, চাকরিজীবি যেদিন অবসরে যায় / শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়,/ যাপিত জীবনের পরিবর্তন হয়, / তখন সে মুক্ত কারো অধীনে নয়। ত্যাগ করতে হয় বহুবিধ অভ্যাস, / প্রাণ ভরে নেয় সে মুক্ত নিশ্বাস। অনেকেই ব্যধিতে আক্রান্ত হয়/ কম সংখ্যক ব্যক্তি নিরোগ রয়। লাইনে দাঁড়িয়ে পেনশন তোলে/ কখনো বা বসে ক্লান্ত হলে / পেনশনের টাকা তোলার যন্ত্রণা / ভৃুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেই বুঝেনা। অবসর জীবনটা তেমন সুখের নয় / চাকরিতে থাকলে যেমনটা হয়। কবি আমিনুর রহমান খান বর্তমানে পাবনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সিনসা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। উত্তর বাংলা সংস্কৃতি পরিষদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়, পাবনার মহাপরিচালক। এনজিও ফোরামে পাবনার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম পাবনার জীবন সদস্য। তিনি একজন সাহিত্য কর্মী। রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। তিনি লিখেছেন ‘ ভেজাল রাজনীতি’ কবিতা। খাদ্যে ভেজাল মিশায় এ কথা জানে সবাই / ভেজাল ওষুধ আছে তাও জানা বাকি নাই/ মাছ ফল টাটকা রাখে দিয়ে ফরমালিন/ সব তেলে ভেজাল বাদ যায়না সোয়াবিন। ভেজাল রাজনীতি আছে জানতোনা কেউ/ এ কথা প্রচার করছে রাজনীতির ফেউ / নেতাকর্মী রাজনীতিকে করছে কলুষিত/দলবলে কখনো হয়না কুন্ঠিত। নীতি এবং আদর্শের কোন বালাই নাই/ নিজ স্বার্থে দলবদল করে সহসাই/ ভেজাল রাজনীতি করার চলছে মহড়া/ দলবদলে পাল্লা দিচ্ছে নেতাকর্মীরা। সকালে করছে একদল/ বিকালে অন্যটি,/ আগের দলের গালি দিতে করেনা ভ্রুকুটি/ ভেজাল রাজনীতিবিদ বাড়েেছ দিন দিন/ এই ভাবে চল্লে অবস্থা হবে সঙ্গীন।
কবি আমিনুর রহমানের কবিতার বই “ সেই রমণী” প্রথম প্রকাশ বই মেলা-২০১৫। প্রকাশক রেহানা সুলতানা শিল্পী, মহিয়সী প্রকাশ, এল এমবি মার্কেট(২য় তলা), পাবনা। প্রচ্ছদ অরণ্য অনি, বর্ণবিন্যাস সীমান্ত সেতু। মুদ্রণে শিল্পনীল এ্যাড। বইটির মূল্য ১৫০ টাকা। পাওয় যাচ্ছে আমেনা খাতুন স্মৃতি পাঠাগার, বুক প্যালেস, দিশারী বই বিতানসহ বিভিন্ন লাইব্রেরী ও বুক স্টলে। কবির আদরের নাতনী যুনাইয়া পারভীন জেফাকে বইটি উৎসর্গ করেছেন কবি আমিনুর রহমান খান। এই বইটিতে মোট ৪৮ টি কবিতা রয়েছে। বইয়ের নামকরণের কবিতা রয়েছে শেষের দিকে। তিনি সেই রমনী কবিতাটি এভাবে লিখেছেন, মিষ্টি হাসি মুখ সেই রমণী / সুধাময় তার চোখের চাহনী / হাসিতে যেন মুক্তা ঝরে / দাঁতগুলি খুব চিক চিক করে / পটল চেরা চোখে কামনা ভরা / টিকলো নাক মন পাগল করা/ রাঙা ঠোঁট দুটি চঞ্চুর মত / আননে হাসি লেগে থাকে সতত/ কপালে কাটা দাগ মনোহর /যা তাকে করেছে আরো সুন্দর। নিজ ব্যক্তিত্ব রেখে বজায় / সবার সাথে মিথে নির্দ্বিধায়/ প্রতিবাদি তবে বেহায়া নয় / সদা সজাগ থাকে চলা ফেরায় / আজকে সেই রমণীকে সুধাই / অন্তরে কেউ পেয়েছে কি ঠাঁই? (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট )।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ: ২৫/০৪/২০২৬.
