নজরুল ইসলাম , গোলাপগঞ্জ(সিলেট) থেকে: গোলাপগঞ্জে সন্ধ্যা হলেই টিলা কাটার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। টিলার পর এবার ইচ্ছেমতো ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এক সময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল পাহাড় টিলা। শীত, বর্ষা সব মৌসুমেই নির্বিচারে এসব টিলা কেটে সাবাড় করায়, অনেক জায়গায়ই পাহাড় টিলার সেই দৃশ্য এখন আর নেই। উপজেলার আমুড়া, বাঘা, লক্ষণাবন্দ, ঢাকাদক্ষিণ ও ভাদেশ্বর ইউনিয়ন সহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোথাও প্রকাশ্যে আবার কোথাও রাতের আঁধারে কাটা হচ্ছে এসব টিলা ও ফসলি মাঠ। আর কাটা টিলা মাটি ব্যবহার করা হয় কৃষিজমি ও পুকুর-জলাশয় ভরাটে। আবার টিলাকেটে মাটি বিক্রি করার ফলে কোন কোনও রাস্তার অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। ঘণ ঘণ ট্রাক ও ট্রাক্টর আসা-যাওয়ার কারণে রাস্তার ওপর মাটি পড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম ঝুঁকি।
এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১২-এর ৬ ধারা) এবং ১৯৮৯ সালের ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন (সংশোধিত ২০০১) অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ থাকলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, মোবাইল সাংবাদিকদের ছত্রছায়ায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলছে মাটি কাটার প্রতিযোগীতা। তবে লোক দেখানো দু‘একটি অভিযান ছাড়া প্রশাসনের বড় কোন ভূমিকা নেই বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা আরোও জানায়, কিছু ব্যক্তিমালিকানরা নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে শ্রমিকদের দিয়ে টিলা সমতল করছে। দিনের বেলায় খননযন্ত্র দেখা গেলেও মানুষের দেখা মেলে না। স্থানীয় লোকজন ভয়ে পাহাড়-টিলা ও জমির মাটি কাটায় জড়িতদের নাম না নিয়ে বলেন টিলাকাটায় জড়িতদের মধ্যে অধিকাংশই জামায়াত ও বিএনপির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনের নজর এড়াতে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টিলা কেটে ট্রাকে ট্রাকে মাটি নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন স্থানে। এক ট্রাক পাহাড়ি লাল মাটি বিক্রি হয় দু থেকে আড়াই হাজার টাকায়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তর কয়েক মাস ‘নিষ্ক্রিয়’ ছিল। এ সুযোগে পূর্বের তুলনায় অনেক জায়গায় অবাধে টিলা ও জমির মাটি কেটে বিভিন্ন প্রকল্প ও বাড়িঘর করার উপযোগী করা হয়েছে। দিন দিন মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে গোলাপগঞ্জ উপজেলা। তাছাড়া গত বর্ষা মৌসুমে পৃথক টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে গোলাপগঞ্জে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাশরাফুল আলম বলেন, ‘কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া হলে স্বাভাবিকের চেয়ে ফলন কম হয়। এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন “পাহাড় কাটার ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আদালত পরিচালনা করে ‘পাহাড়-টিলা ও জমির মাটি কাটায় জড়িতদের জরিমানা করা হচ্ছে।
তিনি আরোও বলেন, ‘কৃষিজমি ভরাট করে বসতবাড়ি কিংবা অন্য কিছু করতে হলে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। কেউ অনুমতি না নিয়ে থাকলে সেটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’
