এবাদত আলী
(পুর্বপ্রকাশের পর)
একটি পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছিলো। সংগঠনের জেলা সভাপতি হিসেবে আমার প্রাধান্যতা থাকলেও মূল প্রোগ্রাম তৈরি ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার ভার দেয়া হয়েছিলো সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ময়েন উদ্দিন, যুগ্ন সম্পাদক নজরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার পারভেজ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক তিলং কুমার চৌধুরীর ওপর। তারা বিলাস বহুল কোচ ভাড়া করে সব কিছুর ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছিলেন।
দিনক্ষণ মোতাবেক আমরা মহানগর পরিবহনের একটি হিনো কোচ যোগে ৩ ফেব্রয়ারি’ ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ সাঁঝ রাতে পাবনা শহর থেকে রওনা
হলাম। আমাদের ভ্রমণের গন্তব্যস্থান চট্রগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ ও রাঙ্গামাটি। এ আনন্দ ভ্রমণের সঙ্গি সংখ্যা ৪০ জন। কোচের ড্রাইভার,
সুপারভাইজার ও হেলপারসহ সর্বমোট ৪৩ জনের একটি দল। কয়েক দিনের সফরে সকলকে এক সঙ্গে কাটাতে হবে। যেন একটি যাযাবর পরিবার।
এদেশে রাস্তাপথে চলতে গেলে নানান ঝক্কি ঝামেলা ওৎ পেতে থাকে চাঁদা পার্টি, রাহু পার্টি, বাহু পার্টি, বাঁশকল পার্টি, থানা পুলিশ,
ফাঁড়ি পুলিশরা বখরা চায়। এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশরাতো হা করে থাকে।
অপর দিকে বিদেশ বিভুঁইয়ে পথ চলতে গিয়ে কখন কি বিপদ-আপদ এসে হাজির হয় তা কে জানে। আর তাই এসব থেকে রেহাই পেতে আগে
ভাগেই পাবনা জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমানের মাধ্যমে তিন জেলার জেলা প্রশাসকদের নিকট পূর্বাহ্নেই ফ্যাক্স মাধ্যমে অনুরোধ পত্র প্রেরণ
করা হয়েছিলো।
শীতার্ত রাতের আাঁধার ভেদ করে হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে সামনের
দিকে এগিয়ে চললো আমাদের বহনকারি কোচটি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-
পুর্ব এবং পুর্ব-উত্তর প্রান্তের পাহাড়ি এলাকা তথা সাগর ও পাহাড়ের
হাতছানিতে আমাদের মন তখন রোমাঞ্চে ভরপুর। সবুজ শ্যামলিমায় ঢাকা
সুবিশাল পাহাড়, চট্রগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, কক্সবাজার ও
টেকনাফের সমুদ্র বেলার্ভূমি, রাঙ্গামাটির নয়নাভিরাম পাহাড়িয়া শহর
তথা কর্নফুলির বিশাল জলরাশি বেষ্টিত হ্রদ যেন আমাদেরকে হাতছানি
দিয়ে ডাকছে। বিলাসবহুল কোচে সহযাত্রিদের মধ্যে প্রায় পনেরো জন
মহিলা, সাত-আট জন শিশু কিশোর ও আমাদের মত মধ্য বয়সীদের যাত্রা সে
এক মজার অনুভূতি। আসলে বয়সে কারো বাধা বিপত্তি বলে কিছু
নেই। যত বাধা মানুষের মনে। আমরা সকলে মিলে নানান গল্প-গুজবসহ
হাসি তামাশায় লিপ্ত হয়ে যেন সম বয়সী হয়ে গেলাম।
আমরা পাবনা শহরের তাড়াশ বিল্ডিংএর সামনে থেকে রওনা হয়ে
কাশিনাথপুর গিয়ে বেড়া- বাঘাবাড়ির দিকে মোড় নিতেই একদল
চাঁদাবাজ বাঁশকল দিয়ে কোচের ড্রাইভার সন্তোষদাকে কোচ থামাতে
বাধ্য করলো। একজন হাত বাড়িয়ে চাঁদা চাইলো। সামনের সিটে বসা
আব্দুল বাতেন প্রশ্ন করলেন কিসের চাঁদা? পাইয়া থাহি, দিয়া যান
অত কথা কোচ্ছেন ক্যান। এই কোচ রিজার্ভ চাঁদা পাবানা। লোকটি
ইশারা করতেই চাঁদা পার্টির আরো কয়েকজন এগিয়ে এলো। এদের
একজনের হাতে তিন ব্যাটারির টর্চ অন্যদের হাতে ছোট ছোট লাঠি।
শুরু হলো ক্যাচাল। তারা বললো রিজার্ভ গাড়ি হলেও চাঁদা দিতে হবে। এক
পর্যায়ে বলা হলো ডিসি সাহেবের অর্ডারে এই কোচ যাচ্ছে, আমরা
ডিসি সাহেবের অফিস ষ্টাফ। বেশি তেড়ি বেড়ি করলে খবর আছে।
জোকের গায়ে লবন দিলে যেমন অবস্থা হয় এও যেন ঠিক তেমনি। তারা
বাঁশকলের বাঁশ শুন্যে তুলে নিলো। এরপর যতবারই চাঁদা পার্টি কিংবা
পুলিশ- ট্রাফিক পুলিশের কবলে পড়া ততবারই একই কথা। আর এটাই
ছিলো আমাদের জন্য মোক্ষম হাতিয়ার। বাঁশকল পার্টি কিংবা পুলিশ
যারাই হোকনা কেন আজো ডিসি এসপির কথা শুনলে ভয়ে জড়োসড়
হয়ে যায়।
যাক এক সময় আমরা বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ সেতু বঙ্গবন্ধু যমুনা
সেতু পার হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। আমাদের
সহযোগিদের অনেকেই তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। শেষ রাতের দিকে ঢাকা
অতিক্রম করে চট্টগ্রামের পথে কোচটি ছুটে চললো। চট্টগ্রাম শহর
থেকে বেশ খানিকটা দুরের একটি ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিবার জন্য
কোচটি থামানো হলো। তখন ভোর হয়ে গেছে। জ্বালানি নেওয়ার অবসরে
দুএকজন করে সারিবদ্ধভাবে প্রায় সকলেই প্রাতঃকর্ম সমাধা করে
নিলো। চলার পথে এ এক মোক্ষম সুযোগ বলতে হবে।
এক সময় আমরা চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছে গেলাম। আগ্রাবাদ এলাকায়
শেখ মুজিব রোডের পাশে “ হোটেল সারাহ” তে গিয়ে উঠলাম।
হোটেলের মালিক আমার বন্ধু ফজলুল করিমের জামাই। পাবনার
ঐতিহ্যবাহি কাজি পরিবারের ছেলে। রওনা হবার আগে তাকে টেলিফোনে
জানানো হয়েছিলো আমাদের ভ্রমণের কথা। সে মোতাবেক হোটেলের
ম্যানেজার মোমতাজ উদ্দিন মন্টু আমাদের আগমণ প্রতিক্ষায় ছিলেন।
ইতোমধ্যে জামাইও এসে হাজির হলেন। হোটেলে উঠেই মুখ হাত ধুয়ে
নেয়া হলো কেউ কেউ আবার বাথ রুমের শাওয়ারে গোসলও সেরে নিলেন।
টেবিলে সাঁজানো গরম খাবার। তন্দুর রুটি আর খাসির রেজালা। সে
সাথে গরম চা। পেট পুরে খাওয়া হলো। কিছু সময় বিশ্রাম নিবার পর
আবার বেরিয়ে পড়া। গন্তব্যস্থান কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত। (ক্রমশঃ) ) (লেখক
ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি.
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব, ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ; ২৩/০৩/২০২৬
