বিশেষ প্রতিনিধি : প্রশাসনের একের পর এক অভিযান, পণ্য ধ্বংস, মোটা অঙ্কের জরিমানা ও কারখানা সিলগালার পরও থামছে না পাবনার ‘ফাস্ট ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরির কোম্পানি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের দফায় দফায় ব্যবস্থা গ্রহণ সত্ত্বেও এই কোম্পানির কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়ে না।
পাবনা পৌর সদরের আফুরিয়া পাটকিয়াবাড়ি এলাকার মৃত নিজামউদ্দিন ওরফে তায়েম উদ্দিনের ছেলে আব্দুর রাজ্জাকের মালিকানাধীন এই কোম্পানি বছরের পর বছর প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে অনুমোদনহীন এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর তিনটি যৌন উত্তেজক সিরাপ—‘ফাস্ট ফ্রুট সিরাপ’, ‘ফাস্ট কিংস ফ্রুট সিরাপ’ এবং ‘ফাস্ট ফিলিংস’।
এসব পণ্যে বিএসটিআই ও ঔষধ প্রশাসনের ভুয়া সনদ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মুদি দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। মূলত রিকশাচালক, ট্রাকচালক, বেকার যুবক, শিক্ষার্থী ও মাদকসেবীরা এসব সিরাপের প্রধান ভোক্তা।
সিরাপগুলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং কোনো ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই তৈরি হচ্ছে। এতে গোপনে মেশানো হচ্ছে প্রেসক্রিপশন ওষুধ ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’ (এসএস পাউডার) এবং লেবেলে উল্লেখ না করে ৪ শতাংশের বেশি অ্যালকোহল, যা লিভার, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সেবনের পর সাময়িক উত্তেজনা দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এসব উপাদান শরীরকে বিকল করে দেয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
এসব সিরাপ গ্রহণের ফলে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নেশাজাতীয় অনুভূতির কারণে এগুলো সাধারণ ভোক্তার পাশাপাশি মাদকসেবীদের কাছেও দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এ যাবত ফাস্ট ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে একাধিকবার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২০১২ সালের ৬ জুন, দৈনিক জীবনকথায় ৩১৮ সংখ্যায় ‘পাবনায় ৪০ হাজার বোতল নকল ড্রিংকস ধ্বংস করেছে র্যাব’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিষাক্ত অ্যালকোহল মিশ্রিত সিরাপ উৎপাদনের দায়ে ফাস্ট ফুড এইচবিডি লিমিটেডকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং কারখানাটি সিলগালা করা হয়।
২০১৫ সালের ১৬ মার্চ, দৈনিক সিনসায় ২৩৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘পাবনায় এনার্জি ড্রিংকসের নামে তৈরি হচ্ছে নেশা জাতীয় পানীয়’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন।
২০১৯ সালের ২৭ জুন, নওগাঁয় ফাস্ট কিংস আপ সিরাপ পান করে এক ব্যক্তি মাতাল অবস্থায় একটি বাড়িতে ঢুকে মাকে হত্যা ও মেয়েকে ধর্ষণ করে। এই ঘটনায় পরদিন দৈনিক সিনসার ৩৪২ সংখ্যায় ‘পাবনার কোম্পানির বিষাক্ত সিরাপ পানে নওগাঁয় তিনজনের মৃত্যু’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে পাবনার ওই কারখানায় ডিবি পুলিশের অভিযান চালিয়ে মালিকপক্ষের তিনজন কর্মচারীকে গ্রেফতার ও কারখানাটি সিলগালা করা হয়।
২০২১ সালের ৭ মে, ২৯৩ সংখ্যায় আবারও শিরোনামে উঠে আসে—‘ফ্রুটস সিরাপের অনুমোদনে তৈরি হচ্ছিল যৌন উত্তেজক সিরাপ’।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাবনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনির নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে, ফাস্ট ফুড কোম্পানির অনেকগুলো গোডাউনে গোপনে লুকিয়ে রাখা অবৈধ সিরাপের একটি গোডাউন থেকে ৫০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের অবৈধ পণ্য জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। একইসঙ্গে কোম্পানিটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে পুনরায় সিলগালা করা হয়। তদন্তকালে দেখা যায়, কোম্পানিটির কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। তারা যে বিএসটিআই-এর সনদ দেখিয়েছে, সেটিও জাল।
প্রতিবার অভিযান চলাকালে মালিক আব্দুর রাজ্জাক গা-ঢাকা দেন, আর গ্রেফতার হন শুধুমাত্র কর্মচারীরা। তবু বিস্ময়ের বিষয় হলো, প্রতিবারই সিলগালা করলেও কিছুদিন পর কোম্পানিটি আবার কীভাবে চালু হয়, তা আজও রহস্যই রয়ে গেছে।
শুধু অবৈধ ও ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন নয়, মালিক আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে জমি দখলেরও অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব সিরাপের প্রধান উপাদান সিলডেনাফিল সাইট্রেট একটি প্রেসক্রিপশন ওষুধ—যা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অনিরাপদ। আর বাজারে প্রচলিত ‘এসএস পাউডার’ নামক উপাদানে চুপিসারে মেশানো হয় এই ওষুধসহ টাডালাফিল জাতীয় উপাদান, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। এ ধরনের সিরাপ আসলে কী উপাদানে তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিত হতে হলে সরকারি পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বছরের পর বছর প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও কেন বন্ধ হচ্ছে না এই মরণঘাতী সিরাপ উৎপাদন? বারবার ধ্বংস ও সিলগালার পরও কেন আবারও সচল হয়ে উঠছে এই বিপজ্জনক কারখানা? এর পেছনে কি প্রশাসনের কোনো অদৃশ্য ছত্রচ্ছায়া কাজ করছে? উত্তরের অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ।
