এবাদত আলী
কোলাকুলি, আলিঙ্গন বা একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরা ভাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করার এক পদ্ধতি। কোলাকুলি বা আলিঙ্গন মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের সভ্যতার সুচনা এবং আবেগ প্রকাশের আদিমতম রূপের সঙ্গে জড়িত। এটি কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয় বরং প্রাকঐতিহাসিক কাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে প্রেম, ভালোবাসা, শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
নৃতাত্তি¡ক ও বিজ্ঞানীদের মতে, ভাষা আবিষ্কারের আগে আদিম মানুষের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিলো অঙ্গভঙ্গি বা ‘ নন-ভার্বাল’ কমিউনিকেশন। তখন কোন গোত্রের মানুষের সাথে অন্য কারো শত্রæতা নেই তা প্রমাণ করার জন্য মানুষ দুহাত প্রসারিত করে আলিঙ্গন করতো। এটি প্রমাণ করতো যে, তাদের হাতে কোন অস্ত্র নেই এবং তারা শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। মায়ের সাথে শিশুর সম্পর্ক ও আলিঙ্গনের মাধ্যমে মানুষের এই প্রবৃত্তির প্রকাশ ঘটে। কোলাকুলি বা পরষ্পর আলিঙ্গন মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন একটি সামাজিক প্রথা যা ভালোবাসা ভ্রাতৃত্ব এবং আন্তরিকতা প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ভাষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীনকালে অত্যন্ত আপন কোন মানুষের সাথে দীর্ঘদিন পর দেখা হলে আবেগে তাকে কোলে তুলে নেওয়ার একটি চল ছিলো। কোল থেকে ‘ কোলাকুলি’ শব্দের উৎপত্তি যা পরে বুকে বুকে মিলিয়ে জড়িয়ে ধরা বা কোলাকুলি করা সামাজিক রূপ নেয়। আদিম সমাজে মানুষ যখন অন্য গোত্রের বা অচেনা কোন মানুষের মুখোমুখি হতো তখন বুকে বুকে মিলানো বা আলিঙ্গন করার অর্থ ছিলো –‘‘ আমার কাছে কোন অস্ত্র লুকিয়ে রাখা নেই, আমি আপনার ক্ষতি করতে আসিনি।’’ এটি ছিলো পরষ্পরের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও আত্মসমর্পণের প্রাচীনতম প্রতীক। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় কোলাকুলি বা আলিঙ্গন ছিলো ভালোবাসা সন্মান এবং ঐশ^রিক আশর্^ীবাদের প্রতীক। সে দেশের প্রাচীন হিয়ারোগিøফ লিপিতে কোলাকুলি বা বাহু বন্ধনকে ‘ ইনক’ বা ‘সেখেন’ বলা হতো।
ধর্মীয় মতে বিভিন্ন ধর্মে কোলাকুলি, আলিঙ্গন ও জড়িয়ে ধরার নিয়ম প্রচলিত আছে। ইসলাম ধর্ম মতে ইসলামি সংস্কৃতি ইতিহাসে কোলাকুলি বা আলিঙ্গনকে ‘মুয়ানাকা’ বলা হয়। আরবি উঁনুক শব্দ থেকে এর উৎপত্তি যার অর্থ ঘাড় বা গলা। দীর্ঘ সাক্ষাতের পর ঘাড়ের সঙ্গে ঘাড় মেলানো এবং বুকের দিকে জড়িয়ে ধরাকে শরিয়তের ভাষায় মুয়ানাকা বলে। ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি প্রাচীন সুন্নত প্রথা। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, মহানবী (সা.) এর সাহাবিরা যখন পরষ্পরের সঙ্গে দেখা করতেন তখন করমর্দন (মুসাফাহা) করতেন। আর যখন তারা কোন দীর্ঘ সফর বা দুর দেশ থেকে ফিরে আসতেন তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করতেন। হাদীস শরীফে আছে, হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এর পালক পুত্র সাহাবী জায়েদ বিন হারেসা (রা.) মদীনায় ফিরে যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ঘরে আসেন তখন নবীজী (সা.) নিজে উঠে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি ও চুম্বন করেছিলেন। মূল ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী কোলাকুলি ডান ঘাড়ের সঙ্গে ঘাড় মিলিয়ে একবার করাই নিয়ম। তবে বাঙালি বা ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে কালক্রমে এটি তিনবার করার প্রথা তৈরি হয়েছে। মুসলিমদের সব চেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ শেষে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই কোলাকুলি করে পুরোনো সব কোন্দল ভুলে যায়।
হিন্দু ধর্মীয় সংষ্কৃতিতেও কোলাকুলির ইতহাস বেশ প্রাচীন। শারদীয় দুর্গা পুজার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের পর সমবয়সীরা পরষ্পরের সাথে কোলাকুলি করেন। এটি শত্রæতা ও অহংকার ভুলে সমাজে শান্তি ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সমাজিক রীতি। খিৃষ্টধর্মে আলিঙ্গনের একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরত্ব রয়েছে। অনেক চার্চে বা উপসনা সভায় খিৃষ্টানরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বা আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। বেীদ্ধ ধর্মে শারীরিক স্পর্শের চেয়ে মানসিক মৈত্রী ও করুণার উপর বেশী জোর দেওয়া হলেও আধুনিক বৌদ্ধ সাংস্কৃতিতে আলিঙ্গনকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। শিখ ধর্মাবলম্বীরা গুরু পর্ব বা ধর্মীয় উৎসবের দিনে তারা একে অপরকে আন্তরিকভাবে আলিঙ্গন করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করেন। আমাদের সমাজে স্বামী স্ত্রী, প্রেমিক পেমিকা যুবক যুবতিদের মাঝে কোলাকুলি বা আলিঙ্গন প্রথা বিদ্যমান। ব্যাপারটা এমন যে, একবার ধরলে আর সহজে ছাড়তে চায়না।
ইতিহাসে আগেকার রাজা-বাদশা, সুলতান বা স¤্রাটদের মধ্যে কোলাকুলি বা আলিঙ্গন ছিলো মূলত গভীর রাজনৈতিক কূটনীতি, পারষ্পারিক মর্যাদা এবং শান্তি চুক্তির এক শক্তিশালী প্রতীক। সে যুগে দুই দেশের শাসকের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ও কোলাকুলি করার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু তাৎপর্য থাকতো। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় কুটনীতিতে যেমন (প্রচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর বা ভারতীয় উপমহাদেশে) সমকক্ষ দুই রাজা যখন একে অপরকে আলিঙ্গন করতেন তখন তারা বোঝাতেন যে, তারা দুজনই সমান ক্ষমতার অধিকারী একে অপরের ভাই। কোন রাজা যদি অন্য রাজার সামনে মাথা নত না করে সোজা হয়ে কোলাকুলি করতেন তবে তা সমমর্যাদার প্রমাণ দিতো। রাজা বাদশাহদের কোলাকুলি সব সময় শান্তির প্রতীক ছিলোনা। কখনো কখনো এটি মারাত্মক ষড়যন্ত্রের ফাঁদ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৬৫৯ খৃীষ্টাব্দে ১০ নভেম্বর ভারতীয় ইতিহাসের ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ ও আফজাল খানের সাক্ষাৎ। বিজাপুরের সেনাপতি আফজাল খান শিবাজীকে আলিঙ্গন করার বাহানা করে তার বিশাল দেহ দিয়ে চেপে ধরে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিচক্ষন শিবাজী আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন এবং নিজের আঙ্গুলে থাকা ‘বাঘ নখ’ ( লোহার ধারালো নখ) দিয়ে আফজাল খানকে বধ করেন।
আমাদের বাংলাদেশে অতি সম্প্রতি এমন কোন অনভিপ্রেত ঘটনা না ঘটলেও সরকারি একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ভাবে গদ গদ হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে হাত মিলিয়ে আলিঙ্গন করতে উদ্দত হয়ে নাকানি-চুবানী খেয়েছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা এবং সোশাল মিডিয়াতে দারুন হৈচৈ পড়ে । গত ২০ অক্টোবর-২০২৬, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে হাত মিলানোর পর কোলকুলি করার জন্য রাষ্ট্রাচার ভেঙে তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোঃ ইউসুফ আলীকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার (ষ্ট্যান্ড রিলিজ) করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছ। এদিন রাজশাহী শাহ মখদুম বিমান বন্দরে এ ঘটনা ঘটে। রশিকজনেরা গ্রাম্য প্রবাদ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এত লালি আজ্জের (আধ সের) না।’ কেউ কেউ আবার ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, ‘ হাতি ঘোড়া গেলো তল, ভেড়া বলে কত জল।’ (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
