সঞ্জু রায়, বগুড়া:
একটি হৃদ্স্পন্দন থেমে যাওয়া মানেই থেমে যেতে পারে একটি জীবন। অথচ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগের নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ না পেয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বগুড়ার অসংখ্য মানুষের। জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্নারে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের মধ্যে এ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
‘প্রতিটি হৃদ্স্পন্দনই জীবন’ প্রতিপাদ্যতে সারা বিশ্বের ন্যায় ২৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। হৃদ্রোগ প্রতিরোধ, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরতেই বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হৃদ্রোগ ও অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার রোগ বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান কারণ; ২০২২ সালে এসব রোগে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ।
উত্তরের প্রাণকেন্দ্র বগুড়াতেও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে এনসিডি কর্নার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলছে এ কার্যক্রম। এনসিডি কর্নারে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের বছরজুড়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জীবনযাপন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। রোগীদের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘সিম্পল অ্যাপ’। নিয়মিত ফলোআপে না আসা রোগীদের ফোন করেও সেবার আওতায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু এই কার্যক্রমে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওষুধের সংকট।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, বগুড়া জেলায় সরকারের বরাদ্দ করা এনসিডি ওষুধের সর্বশেষ চালান এসেছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে সেই চালানও রোগীর প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ছিল। ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত প্রয়োজনীয় সব ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ গ্রহণ এবং ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে অতিরিক্ত শর্করা হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তশর্করাকে কার্ডিওভাসকুলার রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বগুড়া জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত সেবা গ্রহণকারী নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৫২০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬০৭ জন শুধু উচ্চ রক্তচাপের, ৯ হাজার ৯১৩ জন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস উভয় রোগে আক্রান্ত এবং ২০ হাজার ৯৭৩ জন শুধু ডায়াবেটিসের রোগী হিসেবে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, নিবন্ধিত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে, ১৭ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং প্রায় ১৬ শতাংশ নিয়মিত ফলোআপে আসছেন না বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
এনসিডি কর্ণারের সেবাগ্রহীতা গাবতলীর মুদিদোকানি আব্দুস সাত্তার ও রিক্সাচালক রবিন মিয়া জানান, তারা কোনমতে দিন এনে দিন খেয়ে জীবনযাপন করেন। দীর্ঘসময় থেকে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা এনসিডি কর্নার থেকেই বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ সংগ্রহ করে সুস্থ ছিলেন। এখন অনেক মাস হলো দূর দূরান্ত থেকে এসেও বিনামূল্যে চিকিৎসা পেলেও পাওয়া যাচ্ছে না ওষুধ। দিনমজুরির টাকা দিয়ে নিয়মিত ওষুধ কিনে খাওয়াও তাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই তারা সরকারের কাছে আগের মত নিয়মিত ওষুধ সরবরাহের জোর দাবি জানান।
একই সংকটের কথা জানালেন কাহালু উপজেলার আরেক উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগী গৃহিণী মোমেনা বেগম। তিনি জানান, বছরখানেক আগে থেকে তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। অথচ এনসিডি কর্নার থেকে এখন আর বিনামূল্যে ওষুধ না পাওয়ায় চরম ভোগান্তি পরেছেন তিনিসহ অন্যান্য রোগীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় সব ওষুধ নিয়মিত না পাওয়ায় অনেক রোগী ফলোআপে আসার আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে শুধু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই নয়, প্রয়োজনীয় ওষুধের ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত এখন বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাইতো বিশ্ব হার্ট দিবসে শুধু সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করার দাবি সকলের।
