এবাদত আলী
আদি পুরুষের দারিদ্রের বোঝা বয়ে বেড়ায় যারা–গুড়িপাড়ার বসতিদের কথা শুধুমাত্র জীবন ধারনের তাগিদে ভারি লোহা-লক্কড় ও ইট-পাথর বহনের পেশায় নিয়োজিত হবার জন্য ভারতের বিহার রাজ্য থেকে সেই কবে এসেছিলেন জয়রামদের পূর্ব-পুরুষের লোকেরা। তখন ১৯০৯ সাল। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার পাকশী হাডিঞ্জ সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সর্ব বৃহৎ রেল সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ২৪ হাজার শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। তখন স্থানীয়ভাবে তেমন দক্ষ শ্রমিক না পাওয়ায় সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষ সুদুর বিহার রাজ্য হতে কয়েক হাজার নিম্নবর্ণের হিন্দু শ্রমিককে নিয়ে আসেন।
১৯১৫ সালে হাডিঞ্জ সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হলে সেসকল শ্রমিকদের অধিকাংশই নিজ দেশে ফিরে যান। কিন্তু জনা-দশেক শ্রমিক পাকশী এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে হাডিঞ্জ সেতু সংলগ্ন পূর্ব- উত্তর পাশে রেলওয়ের পরিত্যক্ত একটি টিলা ‘গুড়িপাড়ার’ ১২ বিঘা জমির বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করতে আরম্ভ করেন। আশেপাশের বিশাল ঘন বনজঙ্গল ও তাদের দখলে আসে। এসবই রেলওয়ের পরিত্যক্ত জমি। তারা মনের সুখে সেখানে বসবাস করতেন এবং জীবিকার জন্য মৎস্য শিকারকে তারা পেশা হিসাবে গ্রহণ করলেন। জয়রাম বলেন, তহন পদ্মা নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়তো জালে। তার সাথে বোয়াল, আইড়, কাউনে, রিটামাছ জাল দিয়ে ধরতো আমাদের বাপ-দাদারা। তহন গুঁড়া মাছের কোন অভাব ছিলনা। তার সাথে পদ্মা নদীতে ভেসে বেড়ানো ‘শিশুক’ (শুশুক) প্রাণি জাল দিয়ে ধরে তা থেকে বাতের তেল তৈরি এবং বিভিন্ন ডোবা-নালা থেকে কচ্ছপ প্রাণি সংগ্রহ করে তা বিক্রয়ের আয় রোজগার দিয়ে সংসার চালাতো।’ এছাড়া আশেপাশের বনজঙ্গলের ফলবান বৃক্ষের ফল ভক্ষণ ও বিক্রি করে জঙ্গলের কাঠকে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করে বেশ সুখেই তাদের দিন কাটছিলো।
কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর হতেই তাদের দুঃখের দিন শুরু হয়। জয়রাম বলেন, ‘‘কি করতে কি হয়ে গেল আমাদের বাপ-দাদাদের জীবন কোন মতে কাটে গেলিও আমাদের আমল থেকে কষ্টের দিন শুরু হয়ে গেল। পদ্মার পানি শুকোতে লাগলো। ফারাক্কা না কিযেন বাঁধ দিলো ভারত, আর আমাদের পদ্মার পানি গেল শুকে। এখন খালি বালু আর বালু। মাছ নেই শিুশুক নেই। কি করে যে আমাগরে দিন চলে তা বুঝাতে পারতেছিনা স্যার। চলেন দেহেন আমরা কি রহম আছি।’’
২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, পাকশী হাডিঞ্জ সেতু ও লালন শাহ সেতুর পাদদেশে বনভোজনে গিয়ে জানা গেল গুড়িপাড়ার বসতিদের কথা। আমরা কজন সাংবাদিক সেখানে যেতেই দেখা হলো গুড়িপাড়ার বাসিন্দা জয়রামের সাথে। তিনি আমাদের পরিচয় পেয়ে বল্লেন আপনারা সুম্বাদিক যাতি চাচ্ছেন চলেন, এর আগে কিন্তুক কোন সুম্বাদিক, টুম্বাদিক এহানডায় আসেনি। জয়রাম খানিক দম নিয়ে বলে¬ন, কথাকি স্যার আমাদের ইলাকায় কোন মেম্বর চিয়ারম্যান ও আসেনা। ভোট যহন হয় খালি তহনি আসে ।সরজমিনে গিয়ে জানা গেল গুড়িপাড়ার অধিবাসিদের মানবেতর জীবন যাপনের কথা। আমরা কৌতুহলী হয়ে জয়রামের বাড়িতে গেলাম। বাড়ি বলতে মাটির দেয়ালের ওপর পুরাতন মরচে ধরা পাতলা ঢেউ টিনের ঘর। ঘিঞ্জি পরিবেশ। চারপাশে ময়লা আবর্জনা। সামনে এক চিলতে উঠান। এবাড়ি ওবাড়ি হতে বহু কষ্টে খানকয়েক চেয়ার আনা হলো আমাদের বসার জন্য। এলেন এপাড়ার সমাজপতি মুন্নুদা। দেখতে দেখতে এসে জড়ো হলো আরো অনেকে। সরকারি লোক ভেবে সাহায্য পাবার আশায় এলেন কয়েকজন বৃদ্ধ। লক্ষী নামের এক বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে এসে আমাদের কাছে ‘বয়সের’ ভাতার কার্ড চাইলেন। সমাজপতি মুন্নুদা’র কাছে আমরা জানতে চাইলাম তাদের উপার্জন, জীবন- জীবিকা, লেখা-পড়া, স্যানিটেশন হাল-চাল, পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, জমির অধিকার, তাদের ধর্মীয় আচার ইত্যাদি বিষয়ে অনেকগুলো কথা। তাদের সবার কাছ থেকে যেসকল কথা বেরিয়ে এলো তা রীতিমত বিষ্ময়কর ও অমানবিক। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানকার এই জনগোষ্ঠির খবর কেউ নেয়না। এই গুড়িপাড়ায় বর্তমানে ৪০ টি পরিবারের বসতি। লোক সংখ্যা প্রায় ১শ ৫০ জন। শিক্ষিত ব্যক্তি বলতে যা বোঝায় তা তারা জানেনা। এই গুড়িপাড়ায় এপর্যন্ত একজন মাত্র পঞ্চম শ্রেণী পাশ করেছে এবং ঈশ্বরদী ইপিজেড এ লেবার পোষ্টে চাকুরিও পেয়েছে। এখানকার শিশুদের মধ্যে বর্তমানে এনজিও পরিচালিত রেলওয়ে বাজার স্কুলে ১৫/১৬ জন ভর্তি হয়েছে এবং লেখাপড়া করছে। এই গুড়িপাড়ায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। বছর পাঁচেক আগে বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতা হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সংযোগের ব্যবস্থা হয়নি। কবে হবে তা কেউ বলতে পারেনা। স্যানিটেশেন ব্যবস্থা আরো নাজুক। সমাজপতি মুন্নুদা বেশি কথা বলেননা। কি বলবেন তা যেন ভেবে পাননা। জয়রাম বলেন, দুঃখের কথা আর কি কবো স্যার, আমাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে আজকাল আর তাকে আমরা পোড়াতে পারিনা। মৃত দেহ পোড়াতে গেলে দশ মন খড়ির প্রয়োজন হয়। তা তারা যোগাড় করতে পারেনা। জয়রাম বলেন, আগে আমাদের শ্মশানঘাট ছিলো কিন্তুক এখন আর তা নেই। নদীর পাড়ে যে শ্মশানঘাট ছিলো পদ্মার পানি কমে গিয়ে সেখানে এখন চাষবাস হয়। কেউ আর মরা পোড়াতে দিতে চায়না। আমরা এখন নদীর বালুর মধ্যে কোনমতে গর্ত খুঁড়ে পুতে রাখি। অনেক সময় সেসকল মৃতদেহ লাঙলের ফলায় উঠে পড়ে বলেওে জয়রাম জানালেন। গুড়িপাড়ার বাসিন্দাদের পুজা করার জন্য কোন মন্দির নেই। গুড়িপাড়ার অধিবাসিদের একটাই ক্ষোভ কেউ তাদের খবর নেয়না। ভোট এলে কেবল তাদের কদর বাড়ে। তখন মেম্বর পদে দাঁড়ানোর লোক আসে, আসে চেয়ারম্যান পদে ভোটের জন্য। তখন সকলেই দরদি হয়্ কিন্তু ভোট শেষে কেউ আর ফিরা ফুচকিও দেয়না। গুড়িপাড়ার বাসিন্দাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে একটি আদর্শ গ্রাম গড়ে তুলে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা খুবই জরুরী বলে আমাদের মনে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা অনুরোধ করেছিলাম। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী. প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ১৭/০৮/২০২৬.
