খালেদ আহমেদ :
পাবনায় শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর বড়াল নদী থেকে জাহিদ হাসান নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। পুলিশের তদন্তে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর দাবি থাকলেও ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে জাহিদের মৃত্যু শ্বাসরোধজনিত এবং হত্যাজনিত বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—জাহিদ কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল?
জানা গেছে, গত ২০ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জাহিদ নিখোঁজ হন। এরপর ২৩ মার্চ দুপুর আনুমানিক সোয়া ২টার দিকে সাঁথিয়া থানাধীন বড়াল নদীর সিলন্দা বাজার ঘাটের দক্ষিণ কিনারা থেকে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জাহিদের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দিন চাটমোহরের নিজ ভাড়া বাসা থেকে শ্বশুরবাড়ি এলাকার ধুলাউরি ইউনিয়নের রূপসী মৌজার বাউশগাড়ী গ্রামে যেতে জাহিদ অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। পরিবারের দাবি, এরপর জাহিদের স্ত্রী সালমা খাতুন ও তার মা তাকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ দাবি করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার কথা বলে জোরপূর্বক সঙ্গে নিয়ে যান। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ওই দিনই জাহিদকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে।
জাহিদের পরিবারের আরও অভিযোগ, সালমা খাতুনের সঙ্গে অন্য একজনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এ বিষয়টি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছিল বলেও পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হলেও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জাহিদের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। কিন্তু পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য।
ফরেনসিক প্রতিবেদনের ‘Comment’ অংশে বলা হয়েছে, ময়নাতদন্তের ফলাফল ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ বিবেচনায় জাহিদের মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধজনিত অক্সিজেনের অভাবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গলায় চাপ প্রয়োগ করে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল এবং ঘটনাটি জীবিত অবস্থায় সংঘটিত হয়েছে। চিকিৎসকের মতামতে মৃত্যুর ধরন ‘homicidal’ বা হত্যাজনিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ময়নাতদন্তের বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, জাহিদের গলার চারপাশে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে থাকা একটি অবিচ্ছিন্ন ligature mark বা বন্ধনের দাগ ছিল। দাগটির কোথাও কোনো ফাঁক ছিল না এবং সেটি থাইরয়েড কার্টিলেজের সমতলে অবস্থিত ছিল।
অথচ মরদেহ উদ্ধারের পর নগরবাড়ী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মো. আইনুল হক প্রস্তুত করা সুরতহাল প্রতিবেদনে লিখেছেন, জাহিদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়নি। পুলিশের ওই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যের এই পার্থক্যই এখন তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী মো. আমিরুল ইসলাম আয়ুব দাবি করেছেন, মরদেহ দেখতে গিয়ে তিনি জাহিদের পিঠে মারধরের দাগ এবং গলায় ফাঁস বা দড়ির দাগ দেখতে পেয়েছিলেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীর এই দাবি এবং সুরতহাল প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যেও রয়েছে স্পষ্ট অমিল।
এদিকে জাহিদের স্ত্রী সালমা খাতুনের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিবার। পরিবারের দাবি, ঘটনার আগে ও পরে সালমা বিভিন্ন সময় জাহিদকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাবি করে আসছিলেন এবং তাকে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার কথা বলে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নিজের চার বছর বয়সী সন্তান আব্দুর রহমান আস সুদাইসকে নিজের জিম্মায় নেওয়ার জন্য আদালতে করা আবেদনে সালমা উল্লেখ করেন, তার স্বামীকে পূর্বশত্রুতার জেরে কে বা কারা হত্যা করে সিলন্দা বড়াল ব্রিজের নিচে ফেলে রেখে যায়।
অর্থাৎ একই ঘটনার বিষয়ে একদিকে জাহিদকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করে আত্মহত্যার কথা বলা এবং অন্যদিকে আদালতের আবেদনে পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যার কথা উল্লেখ করার বিষয়টি নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
জাহিদের মৃত্যুর পর তার চার বছর বয়সী ছেলে দাদা কাজেম আলীর কাছে থাকছিল। সন্তানকে নিজের জিম্মায় নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করেন সালমা খাতুন। ওই আবেদনে তিনি তার স্বামীকে পূর্বশত্রুতার জেরে হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন বলে নথিতে দেখা গেছে।
অন্যদিকে জাহিদের বাবা কাজেম আলী ২৩ মার্চ সাঁথিয়া থানায় তার ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঠিক তদন্ত চেয়ে অভিযোগ করেন। পরে ৯ এপ্রিল পাবনা জেলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে পুত্রবধূ সালমা খাতুনকে প্রধান আসামি করে মোট চারজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় তদন্ত ও মামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এসব নথিতে এক পর্যায়ে বলা হয়েছে, ২৩ মার্চ সাঁথিয়া থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর অপমৃত্যু মামলা নম্বর-৮ রুজু করা হয় এবং নগরবাড়ী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মো. আইনুল হক মামলাটি তদন্ত করেন। ওই পর্যায়ে কোনো ফৌজদারি মামলা রুজু হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথা বলা হলেও ময়নাতদন্তে গলায় সম্পূর্ণ বেষ্টনকারী ligature mark দাগ পাওয়া গেছে এবং ফরেনসিক চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামতে শ্বাসরোধজনিত হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, প্রাথমিক তদন্তের সময় গলার গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নটি কীভাবে পুলিশের নজর এড়িয়ে গেল? সুরতহাল প্রতিবেদনে কেন আঘাত বা গলার দাগের বিষয়টি উল্লেখ করা হলো না? ময়নাতদন্তে যদি জীবিত অবস্থায় শ্বাসরোধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—২০ মার্চ জাহিদ যদি স্বেচ্ছায় শ্বশুরবাড়ি যেতে না চান এবং পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী তাকে ‘চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার’ কথা বলে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ওই দিনের গতিবিধি, কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় গিয়েছিল এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না।
জাহিদের পরিবারের দাবি, ২০ মার্চ তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাই তার নিখোঁজ ও পরবর্তী মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাকে সেদিন বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ওই দিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, লোকেশন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, যাতায়াতের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ঘটনায় জাহিদের পরিবার নগরবাড়ী নৌ পুলিশের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম, গাফিলতি, প্রভাব বা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তারা। তবে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
পরিবারের অভিযোগ, ময়নাতদন্তে হত্যাকাণ্ডের মতামত আসার পরও যদি আত্মহত্যার তত্ত্ব সামনে রাখা হয়, তাহলে তা জাহিদের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তারা আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে।
জাহিদের পরিবারের সদস্যরা সালমা খাতুনসহ মামলার অন্য অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছেন—ময়নাতদন্তে যখন চিকিৎসকের স্পষ্ট মতামত হত্যাজনিত মৃত্যুর কথা বলছে, তখন তদন্ত কোন পথে এগোচ্ছে?
জাহিদের পরিবার ও স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং ফরেনসিক চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামত যখন পরস্পরবিরোধী, তখন কোনটি সত্য? আত্মহত্যার তত্ত্ব কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? সুরতহাল প্রতিবেদনে গলার দাগ বা আঘাতের বিষয়টি কেন উঠে আসেনি? আর ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত পাওয়ার পরও তদন্তে কোনো গাফিলতি হয়েছে কি না?
এখন জাহিদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ ও পুনঃতদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে তদন্তে কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি না কিংবা কোনো অনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে পরিবার।
জাহিদ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল—ময়নাতদন্তের হত্যাজনিত মতামত, সুরতহাল প্রতিবেদনের অসঙ্গতি এবং মৃত্যুর আগে তার গতিবিধি ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এখন সেই রহস্যের জট খুলতে পারে।
