পারমাণবিক আইসব্রেকারে বাংলাদেশের প্রত্যয়ের রোমাঞ্চকর উত্তর মেরু অভিযান সম্পন্ন

ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা:

রোসাটমের ৭ম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক অভিযান ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’-এ অংশ নিয়ে উত্তর মেরু অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করে রাশিয়ার মুরমানস্ক শহরে ফিরেছে বাংলাদেশের কিশোর শিক্ষার্থী মালেহুল সালেহীন প্রত্যয়। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পারমাণবিক আইসব্রেকার ‘৫০ লেট পোবেদি’ (50 Let Pobedy)-তে চড়ে ১০ দিনের এই রোমাঞ্চকর অভিযানে অংশ নেয় বলে রোসাটমের মিডিয়া উইং শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।

মুরমানস্ক থেকে উত্তর মেরু, সেখান থেকে ফ্রাঞ্জ জোসেফ ল্যান্ড হয়ে আবার মুরমানস্ক—এটাই ছিল অভিযানের নির্ধারিত পথ। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, জলপথে এটি ছিল উত্তর মেরুর ২০০তম অভিযান।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রত্যয় বলে, “স্বপ্ন থেকে বিশ্বের চূড়ায় পৌঁছানোর এই যাত্রা আমার জন্য অবিস্মরণীয়। ২২টি দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হওয়ার অনন্য সুযোগ পেয়েছি। মেরিন বায়োলজি, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছে। উত্তর মেরু আমাকে যে জ্ঞান, বন্ধুত্ব ও স্মৃতি উপহার দিয়েছে, তা আমি চিরকাল সযত্নে লালন করব।”

১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ অভিযানের আয়োজন করা হয়। প্রত্যয় এর আগে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স কম্পিটিশন, দ্য কুইন্স কমনওয়েলথ রচনা প্রতিযোগিতা, ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ম্যাথ চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছে।

পারমাণবিক আইসব্রেকার ‘৫০ লেট পোবেদি’-এর ক্যাপ্টেন রুসলান সাসোভ বলেন, “এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণেরাই এসব অভিযানে অংশ নেয়। তাদের অনেকেরই উত্তর মেরু দেখা এবং মেরু ভল্লুক দেখার স্বপ্ন ছিল। রোসাটম ও আমাদের নাবিক দল সেই স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।”

অভিযানজুড়ে অংশগ্রহণকারীদের জন্য জাহাজে আয়োজন করা হয় বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি। সেখানে ছিল একটি অত্যাধুনিক অ্যারোস্পেস ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

অভিযানের সময় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দুটি বিশেষ পরীক্ষাতেও অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। আর্কটিকের দুর্গম অঞ্চল এবং উত্তর সমুদ্রপথে যোগাযোগে সহায়তার লক্ষ্যে তারা একটি রেডিওসন্ড (Radiosonde) উৎক্ষেপণ করে। পাশাপাশি বিশ্বের প্রথম পুনরুদ্ধারযোগ্য স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক প্ল্যাটফর্মের পরীক্ষাতেও অংশ নেয় তারা।
রোসাটমের সায়েন্টিফিক ডিভিশনের অংশ এনআইআইটিএফএ (NIITFA)-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার ইয়েগোর প্লাখোতনিউক বলেন, “রোসাটমে আমরা প্রতিদিন এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি, যা গতকালও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলে মনে হতো। অভিযানের মাধ্যমে কিশোররা রুশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেয়েছে। রুশ বিজ্ঞান এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে, যা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।”

উত্তর মেরুতে পৌঁছানোর পর অভিযাত্রী দলের সদস্যরা পৃথিবীর সর্বউত্তর বিন্দু ৯০ ডিগ্রি অক্ষাংশের চারপাশে প্রতীকী বৃত্তাকার নৃত্যে অংশ নেয়। এতে সংগীত পরিবেশন করে বাশকোর্তোস্তানের জনপ্রিয় মিউজিক্যাল গ্রুপ ‘AY YOLA’।

অভিযানের অংশ হিসেবে একটি সৃজনশীল প্রকল্পেও অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। সমুদ্রযাত্রার সময় তারা খ্যাতিমান সায়েন্স ফিকশন লেখক সের্গেই লুকিয়েনেঙ্কোর সঙ্গে কাজ করে একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি তৈরি করে। গল্পটি পরবর্তীতে রোসাটমের ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ প্রকল্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে প্রকাশ করা হবে।
‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ রোসাটমের সহায়তায় পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক প্রকল্প। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে তরুণদের আগ্রহী করে তোলা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করা, তাদের দক্ষতা বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়াই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। গত সাতটি মৌসুমে বিভিন্ন দেশের ৪৭০ জনের বেশি মেধাবী স্কুলশিক্ষার্থীকে আর্কটিক ভ্রমণের সুযোগ দিয়েছে প্রকল্পটি।

রাশিয়াই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার সক্রিয় পারমাণবিক আইসব্রেকার বহর রয়েছে। এসব আইসব্রেকারের মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলে পরিচালিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।