ওসমান গনি বেড়া (পাবনা)
দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে দুগ্ধ খামারিদের। দুধ ও মাংসের বড় একটি অংশ সরবরাহ করা হয় দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে। দুধের জোগানের ক্ষেত্রে সামনের সারিতে রয়েছে পাবনার বেড়া উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল। কিন্তু একদিকে গো-খাদ্যের চড়া দাম, অন্যদিকে দাদন ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে দুধের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না এসব চরাঞ্চলের প্রান্তিক ক্ষুদ্র খামারিরা।
তারা দাদন সিন্ডিকেটের হাতে রীতিমতো বন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া গবাদি পশু পালনে প্রশিক্ষণ না পাওয়া, আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়াসহ আরও অনেক সমস্যায় জর্জরিত ক্ষুদ্র খামারিদের জীবন। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবল সমস্যার কারণে প্রান্তিক পর্যায়ে কিছু এলাকায় একটু সমস্যা হচ্ছে। এসব সমস্যা নিরসনের জন্য কাজ চলছে। শিগগির সব সমস্যা কেটে যাবে বলেও আশার আলো দেখাচ্ছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।এ বিষয়ে তথ্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলে বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে পুরো উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে মোট গো-খামারের সংখ্যা ১১ হাজার ২৫৫ টি এবং গবাদিপশুর সংখ্যা ৮৮ হাজার ৩৫৬ টি। বেড়া উপজেলায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাছাইকৃত উৎপাদনকারী দলের (পিজি গ্রুপ) কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানান এ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলার নাকালিয়া বাজারের দুধ ব্যবসায়ী সনৎ দাস বলেন, তিন চর মিলে ৭০-৮০ জন খামারিকে আমরা দুধের ওপর দাদন দিয়েছি। গাভিন গরুপ্রতি ৫০-৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাদন নিয়ে থাকেন খামারিরা। প্রতি লিটার দুধের দাম ৪৪-৪৫ টাকা হারে দিয়ে থাকি। তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চল থেকে দুধ সংগ্রহ করতে লোকবল খরচ রয়েছে। দুধ আনতে ঘোড়ার গাড়ি, নৌকা ভাড়াসহ সব মিলিয়ে লিটারপ্রতি কমপক্ষে ৩ টাকা খরচ হয়। দেশের দুধ কোম্পানি প্রাণ, আকিজ, ব্র্যাক, মিল্ক ভিটা, আড়ংসহ বিভিন্ন দুধ কোম্পানিতে এসব দুধ বিক্রি করে থাকি। কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার দুধের দাম দিচ্ছে ৪৭-৫৩ টাকা হারে। খরচ বাদ দিয়ে আমাদের সামান্য কিছু লাভ থাকে।সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের চর সাঁড়াশিয়া ও চর নাকালিয়া গ্রাম ছাড়াও চর নাগদাহ, চর পাইখন্দ, চর সাফুল্লা, বেঙালিয়া, হাটাইল এবং আঁড়ালিয়াতে ভালো নেই ক্ষুদ্র খামারিরা। এসব চরে খামারের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চার-পাঁচটি করে গরু আছে। কথা হয় চর নাকালিয়া গ্রামের খামারি কোরবান শেখের সঙ্গে। এ সময় তিনি জানান, বাজারে ১ লিটার দুধ খুচরা পর্যায়ে ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হলেও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা প্রতি লিটার দুধের দাম পাচ্ছেন মাত্র ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা। এতে করে তারা দুধের উৎপাদন খরচ পর্যন্ত উঠাতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করেন কোরবান শেখ। স্থানীয় আরেক খামারি নাসির মোল্লা বলেন, অনেক ক্ষুদ্র গো-খামারি জমিজমা চাষাবাদ এবং গরু কেনার জন্য স্থানীয় দুধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে থাকেন। দাদনের শর্ত অনুযায়ী দাদনের টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ওই ব্যবসায়ীকে দুধ দিতে হবে। দাদন ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে বাজার মূল্য থেকে অনেক কম দামে দুধ দিতে খামারিদের বাধ্য করছে।
আরেক খামারি পরান শেখ বলেন, খামারিদের কেউ কেউ বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে দুধ দিতে অস্বীকার বা প্রতিবাদ করলে দাদন ব্যবসায়ীরা তাদের দাদনের টাকা ফেরত দিতে চাপ দেয়। খামারিরা দাদনের টাকা ফেরত দিতে না পারায় বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়েই তাদের দুধ সরবরাহ করে থাকেন।
চর নাগদাহ গ্রামের আফান শেখ বলেন, বাজারে সব ধরনের গো-খাদ্যের মূল্য অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় এবং দুধ ব্যবসায়ীদের কম দামে দুধ সরবরাহ করায় চরাঞ্চলের দুগ্ধ খামারিরা লোকসান দিতে দিতে আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ছেন। আবার অনেকেই গাভিন গরু বিক্রি করে গো-খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। এ কারণে চরাঞ্চলে ক্রমাগত দুধের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, উপজেলার চরাঞ্চলে অর্ধশত দুধ ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা দাদনের মাধ্যমে এসব অঞ্চলের খামার থেকে দুধ সংগ্রহ করে থাকেন।
