এবাদত আলী
চট্রগ্রামের মত আমাদের পাবনা জেলা তথা আশেপাশের কোন জেলাতেই কোন পাহাড়-পর্বত নেই। গোটা উত্তরাঞ্চলেও না। নেই কোন সাগর আর সাগরের বেলাভূমি। তাইতো বার বার মন ছুটে যায় সবুজ শ্যামলিমায় ঢাকা সুবিশাল পাহাড় পর্বত, আর সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়া জলরাশির ফেনা মিশ্রিত সাগরের উথাল পাথাল ঢেউ। এমন বৈচিত্রময় দৃশ্যাবলী বার বার দর্শন করেও যেন সাধ মেটেনা। তাইতো চট্টগ্রাম ভ্রমণের জন্য মনটা কেমন যেন আনচান করে বেড়ায়। সুযোগ খুঁজতে থাকি সেখানে যাবার জন্য। আর একসময় সুযোগও মিলে যায়। আমার এক ভাগ্নে আটঘরিয়ার ব্র্যাকপাড়ার আব্দুর রহিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভেিগর ছাত্র। সবেমাত্র অনার্স পরীক্ষা দিয়েছে। সে থাকে চট্টগ্রামের লালখাঁন বাজারের বাঘঘোনা এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। তার ওখানে যাবার জন্য বার বার আমন্ত্রণ পাওয়া গেলেও কাজের চাপে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবার একটি সুযোগ এসে হাজির হলো নিজের অজান্তেই। আমার প্রতিবেশী সুহৃদ আব্দুর রহমান রানা চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পরীক্ষা দেবে। এখানে একথা বল্লে অতুক্তি হবেনা যে, আমি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বাংলা অনার্সে লেখাপড়া করার সময় হঠাৎ করেই সরকারি চাকরি জুটে যায়। কথায় বলে ‘সরকারি যে কোন চাকরি দুদভাত’ । পারিবাকি ও অন্যন্য কারণে আমাকে পড়ালেখার ইতি টেনে চাকরিতে যেগদান করতে হয়। আমি ভেবেছিলাম চাকুরি করার পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যাবো। গ্রাম্য একটি প্রবাদ আছে ‘‘যা হয়না বিয়ের রাতি তা কি হয় আশি^ন আর কার্তি?’’ । আমার দশাও যেন তাই। কর্ম জীবনে প্রবেশ করার পর শত চেষ্টাতেও তা আর স,্ভব হয়ে ওঠেনি।
ব্যাপারে আব্দুর রগমান রানা আমাকেও উদ্বুদ্ধ করে। তাই বহিরাগত হিসেবে আমিও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের াদেিন বি এ পরীক্ষা দিবার ব্যাপারে যথাসময়ে ফরম পূরণ করি এবং আব্দুর রহমান রানার সঙ্গে পরীক্ষা দিবার জন্য চট্টগ্রামে যবার প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আমার অর্জিত ছুটি পাওনা থাকায় শ্রান্তি বিনোদনের জন্য উর্ধতন কতৃপক্ষ বরাবর আবেদন জানানো হয় ১ মাস ছুটির জন্য। কর্তৃপক্ষ আমার ছুটি মন্জুর করেন। দিনক্ষন মোতাবেক আমার অফিসের সহকর্মীর নিকট অফিসের চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে আমরা চট্টগ্রামের পথে রওনা হলাম।
১৯৯২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল সাতটায় আমার পাবনা সদরের টেবুনিয়ার বাসা থেকে রওনা হয়ে ইনসাফ স্পেশাল পরিবহনে আশি টাকা ভাড়ায় প্রথমে ঢাকার পথে রওনা হই। পাবনা থেকে কাশিনাথপুর হয়ে নগরবাড়ি ঘাট। সেখানে ফেরিতে যমুনা নদী পার হয়ে আরিচা ঘাটে গিয়ে ঢাকার গাবতলি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছলাম। গাবতলিতে রানার ভগ্নিপতির বাসা। সে বাসায় গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল বেলা আমরা কমলাপুর রেলস্টেশনে গেলাম। কিন্তু কমলাপুর হতে চট্টগ্রাম গামি তুর্ণা নিশীতা এমনকি পরদিন মহানগর-প্রভাতির টিকেটও পাওয়া গেলানা। অগত্যা আমাদেরকে আবার রানার ভগ্নিপতির বাসা গাবতলীতে ফেরত আসতে হলো।
পরদিন সকালে উক্ত বাসা থেকে বেরিয়ে চট্টগ্রামগামী কোচ চ্যলেঞ্জারের টিকেট কাটা হলো। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ভাড়া এক’শ টাকা। কোচ ছাড়লো সকাল নটায়। চট্টগ্রামের পথে কোচ যোগে এই আমার জীবনের প্রথম যাত্রা। তাই মনে দারুন রোমাঞ্চ আর উৎকণ্ঠা। আমরা চট্ট্রগ্রামে যাবো। সাগর আর পাহাড় একসঙ্গে দুটোই দেখবো। সাগার আর পাহাড় যেন আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমরা একসময় মিরেশ্বরাই পৌছে গেলাম। এই প্রথম পাহাড়ের চুড়া দেখা গেল। তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে লাগলাম। আমরা যতই সামনের দিকে এগুচ্ছি ততই রাশি রাশি পাহাড় আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। চোখ যেন ফিরানো দায়। একসময় বার আওলিয়া বাজার পেরিয়ে ফৌজদারহাট পেলাম। ডাইনে সমুদ্র তীর। সাগর আর পাহাড়ের এমনি লুকোচাির খেলা দেখতে দেখতেআমরা চট্টগ্রামের টাইগারপাস পৌঁছে গেলাম। কোচ থেকে নেমে লালখান বাজার হয়ে বাঘঘোনা পাহাড়। এই পাহাড়ের পাদদেশেই থাকে আমার ভাগ্নে আব্দুর রহিম। বাঘঘোনার জাহাঙ্গির সাহেবের ৪ তলা বাসার একটিতে আব্দুর রহিম ভাড়া থাকে। আমরা বাসায় উঠেই গোসল সেরে সিলাম। রহিম তখনো বাসায় ফেরেনি। কাজের বুয়া আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলো। আমাদের এমন ক্ষুধা পেয়ে বসেছিলো যে, রহিমের ভাত শুদ্ধ দুজনে সাবাড় করে ফেল্লাম। বুয়া মৃদু হেসে আবার ওর জন্য হাঁড়ি চড়িয়ে দিলো। আমরা দুজনে একটি লম্বা ঘুম দিয়ে নিলাম। বিকাল বেলা ফ্লাটের বারান্দায় গিয়ে বসতেই কাজের বুয়া মিরনের মা আমাদের জন্য চা করে দিলো। বাসাটি বেশ সুন্দর ও ছিমছাম। বারান্দায় বসেই পাহাড় দেখা যায়। পূর্ব- পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ যে দিকেই তাকানো যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আমরা যেন পথ ভুল করে পাহাড়ের রাজ্যে এসে পড়েছি। বিশাল বিশাল বৃক্ষ রাজি ও লতাগুল্মে ভরা সবুজ শ্যমলিমা পাহাড়ের দৃশ্যাবলী অবলোকন করে হদয় জুড়িয়ে যায়।
রাতের বেলা আব্দুর রহিম ফিরে এলো। পরদিন সকালে গেলাম চট্টগ্রাম কলেজে। এই কলেজটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। কলেজে যেতে আসতে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পরীক্ষার প্রবেশপত্র উঠানো হলো। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে যেটুকুন সময় পাওয়া গেল আমরা প্রাণভরে বেড়িয়ে নিলাম।
আমাদের ভ্রমণসূচীতে সর্বপ্রথম সুলতানুল আওলিয়া হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) এর মাজার শরীফের নাম উঠে এলো। পরদিন সকাল বেলা তাই তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। লালখাঁনবাজার থেকে একটি বেবিট্যাক্সিতে করে মাজার এলাকায় গিয়ে পৌঁছলাম। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট )।
এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব। তারিখ: ১০ / ০৬ /২০২৬.
