খালেদ আহমেদ :
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত আইএলও’র ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের অংশ হিসেবে সোমবার (৮ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল পৌঁনে ৫টায় জাতিসংঘ দপ্তরের টেম্পাস হলে তিনি এ বক্তব্য দেন।
সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি আইএলও মহাপরিচালকের সময়োপযোগী ও চিন্তাশীল প্রতিবেদনের প্রশংসা করেন এবং ন্যায়বিচার, মর্যাদা, সমতা ও সবার জন্য শোভন কাজ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইএলও’র মূলনীতি ও আদর্শের প্রতি বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে তিনি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আস্থা ও স্বীকৃতির প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ন্যায্য দাবি-দাওয়া উপস্থাপনের জন্য সম্মিলিত আলোচনায় অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থান হ্রাস, যুব বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়গুলো নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের প্রায় ৭ কোটি ৩৫ লাখ কর্মশক্তি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সুরক্ষায় অধিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দক্ষতা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ভিত্তিক একটি বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
তিনি ডিজিটাল বৈষম্য ও দক্ষতার ব্যবধান দূর করা, এআই প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপদ ও দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে তিনি বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যা মানব মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে বা সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়।” এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংহতি ও কার্যকর সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতিতে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, স্বীকৃতি ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি “প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে শোভন কাজ” বিষয়ক প্রস্তাবিত আইএলও কনভেনশনকে স্বাগত জানান। পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
শিমুল বিশ্বাস তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি দুটি মৌলিক কনভেনশনসহ আইএলও’র তিনটি কনভেনশন অনুমোদন করেছে। তিনি শ্রম আইন সংস্কার, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সংলাপ আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
সবশেষে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও টেকসই কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বের সকল শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, আইএলও’র ১১৪তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি গত ৩০ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনসমূহ ও সরকারের মনোনয়নে তিনি শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করছেন। ৩১ মে থেকে ১২ জুন পর্যন্ত চলমান এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শ্রম, কর্মসংস্থান ও শ্রমিক অধিকার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় করছেন।
