সুন্দরগঞ্জে প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস জনজীবন, বিপাকে শ্রমজীবী মানুষ

হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধিঃ
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলাজুড়ে গত এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দিনের বেলায় প্রখর রোদ ও গরম বাতাসে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, রিকশা-ভ্যানচালক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণকর্মী এবং শিক্ষার্থীরা। প্রচণ্ড তাপদাহে অনেক দিনমজুর কাজ করতে না পেরে ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে তাদের পরিবারে দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুপুরের পর রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। খোলা মাঠে কিংবা বাজার এলাকায় মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে অনেকেই গাছের ছায়া, পুকুরপাড় কিংবা বাঁশঝাড়ের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বিকেলের দিকে পুকুরপাড়ে অবস্থান করে কিছুটা স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করছেন।

প্রচণ্ড গরমের কারণে উপজেলার বিভিন্ন পুকুর, খাল ও নদীতে শিশু-কিশোরদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তারা পানিতে গোসল ও খেলাধুলার মাধ্যমে গরম থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। আবার অনেক পরিবার গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ির উঠান কিংবা বারান্দায় বসে সময় কাটাচ্ছে, কারণ ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছে।

দক্ষিণ ধুমাইটারী গ্রামের দিনমজুর মোনারুল ইসলাম বলেন, সংসারের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কয়েকদিন ধরে এমন গরম পড়েছে যে কাজ করতে গিয়ে মনে হয় শরীর থেকে প্রাণ বের হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি ফিরে গোসল করার পরও শরীরে শক্তি থাকে না। বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

পৌর শহরের রিকশাচালক ভুট্টু মিয়া বলেন, একটি ভাড়া শেষ করার পর আরেকটি ভাড়া নিতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু পেটের দায়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। গরমে শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আগের তুলনায় আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, অথচ যাত্রীরা ভাড়া বাড়াতে রাজি নয়।

তীব্র গরমে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে টিনশেড ভবনগুলোতে গরমের মাত্রা বেশি হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই ভোগান্তিতে পড়ছেন।

শিক্ষার্থী তাহসিন আহম্মেদ বলেন, ফ্যান চললেও শ্রেণিকক্ষে প্রচণ্ড গরম লাগে। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ রাখা কঠিন হয়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ বোধ করে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে মর্নিং স্কুল চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রান্নার কাজে নিয়োজিত বাবুর্চি ও গৃহিণীরা। চুলার সামনে দীর্ঘ সময় কাজ করায় তাদের কষ্ট কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

রহিদাস হোটেলের বাবুর্চি অতুল চন্দ্র বলেন, চুলার সামনে দাঁড়িয়ে রান্না করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড তাপের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। তারপরও দায়িত্বের কারণে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

এদিকে রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রংপুর অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। এছাড়া রাতের দিকে কোথাও কোথাও হালকা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নূর মোহাম্মদ বলেন, ফ্যান চলার পরও প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশুরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তবে সরকারি নির্দেশনা ছাড়া মর্নিং স্কুল চালুর কোনো সুযোগ নেই।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সাইদুর রহমান বলেন, প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষ দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন তাপজনিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই সবাইকে বেশি করে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে শীতল রাখার চেষ্টা করতে হবে।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত বৃষ্টিপাত না হলে তাপদাহের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন