সাংবাদিকতার চার যুগ-২৯

এবাদত আলী

সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার সুবাদে ২০১৮ সালের মে মাসের ৯ তারিখে ‘‘ বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় গ্রাম আদালতের ভুমিকা’’ শীর্ষক কর্মশালায় যোগদান করি।
কর্মশালায় আলোচিত বিষয় পাঠকবৃন্দের সমীপে হুবহু তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। এদের মধ্যে আবার কিছু সংখ্যক মানুষ দারিদ্র সিমার নিচে বসবাস করে।এই সকল ব্যাপক গ্রামীণ জনগোষ্ঠিকে বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ক্ষমতায়ন করা যাতে তারা তাদের প্রতি সংঘটিত অন্যায় সমুহের প্রতিকার চাইতে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে অল্প সময়ে, সল্প খরচে ও সচ্ছতার সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে- এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সরকার ১৯৭৬ সালে ভিলেজ
কোর্ট বা গ্রাম আদালত গঠন করে। দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘ সুত্রিতা, গ্রামীণ জনগোষ্ঠিকে ছোট খাটো বিরোধের জন্য
জেলা শহরে যেতে হয় এবং যে কোন আদালতে মামলা দায়ের করতে গেলে উকিল নিয়োগ করতে হয়। এতে অর্থের অপচয় এবং দীর্ঘসুত্রিতার
কারণে মানুষ হয়রানির সম্মুখিন হয়ে থাকে।
ভিলেজ কোর্ট বা গ্রাম আদালত ১৯৭৬ সালে গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা হলেও তা পরবর্তীকালে ২০০৬ সালের ৯ মে কার্যকর করা হয়। গ্রাম আদালত
আইন ২০০৬ অনুযায়ি ছোট খাটো ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ স্থানীয়ভাবে মিমাংসার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় গ্রাম আদালত
গঠিত হয়। যে ইউনিয়নে বিরোধ সৃষ্টি হয় সেই ইউনিয়নেই গ্রাম আদালত গঠন করা হয়। গ্রাম আদালত সর্বোচ্য ৭৫ হাজার টাকা

মুল্যমানের ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি করতে পারে। গ্রাম আদালতের একটি বৈশিষ্ট হলো যে, এতে আইনজীবী নিয়োগের কোন বিধান নেই। সংঘটিত বিরোধের জন্য স্থানীয়ভাবেই এর মিমাংসার সুযোগ রয়েছে। গ্রাম আদালতে পক্ষগণ নিজের কথা নিজেই বলতে পারে এবং নিজেই নিজের প্রতিনিধি নিয়োগ ও করতে পারে। প্রতিনিধি মনোনয়নে আবেদনকারি অর্থাৎ বাদি ও প্রতিবাদি সমান সুযোগ লাভ করে থাকে। গ্রাম আদালতে উভয় পক্ষের সমান অংশগ্রহন নিশ্চিত করা হয়।
গ্রাম আদালতে সমঝতার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, এক বিরোধ থেকে অন্য বিরোধের সৃষ্টি হয়না। বিরোধীয় পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সম্পর্ক
পুনস্থাপন হয়।
তাই বলে গ্রাম আদালতে সকল ধরণের বিরোধই নিষ্পত্তি করার বিধান
নেই। যেমন; ধর্ষণ, খুন, অপহরণ, ডাকাতি, বহু বিবাহ, তালাক, ভরন-
পোষণ, অভিভাকত্ব, নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌতুক, দেনমোহর, দাম্পত্য
সম্পর্ক পুনুরুদ্ধার, কোন ঘটনায় রক্তপাত ঘটে থাকলে, স্থাবর সম্পত্তির
সত্বাধিকার সংক্রান্ত এবং ৭৫ হাজার টাকার উপরের যে কোন মামলা
গ্রহণ ও তার বিচার কার্য পরিচালনা করতে পারেনা। তবে গ্রাম আদালতে
চুরি, ঝগড়া বিবাদ,কলহ বা মারামারি, দাঙ্গা, প্রতারণা, ভয় ভীতি
দেখানো বা হুমকি দেওয়া, কোন নারীর শালীনতাকে অমর্যাদা করা বা
অপমানের উদ্দেশ্যে কথা বলা, অঙ্গভঙ্গি করা বা অন্য কোন কাজ করা।
কাউকে বল প্রয়োগ করে জখম করা, উত্যক্ত করা, গচ্ছিত কোন মুলবান
সম্পত্তি আত্মসাৎ করা, পাওনা টাকা আদায় সংক্রান্ত, কোন অস্থাবর
সম্পত্তির জবর দখল বা ক্ষতি করার জন্য ক্ষতিপুরণ আদায় সংক্রান্ত, গবাদি পশু
মেরে ফেলা বা গবাদি পশুর ক্ষতি সংক্রান্ত এবং কৃষি শ্রমিকদের পরিশোধ
যোগ্য মজুরি ও তার ক্ষতিপুরণ আদায় সংক্রান্ত ইত্যাদি মামলা গ্রাম
আদালতে দাখিল করা যায়। ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত আবেদনকারির
আবেদন পাবার পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান একটি গ্রাম আদালত গঠন
করবেন। প্রত্যেকটি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক পৃথক আদালত গঠন
করা হয়ে থাকে। গ্রাম আদালতে প্রতিকার পাবার জন্য আবেদনকারিকে
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করে তাপুরন পুর্বক
চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করতে হয়য়। আবেদন দাখিল করার সময়

আবেদনকারিকে ফৌজদারি মামলার জন্য ১০ টাকা এবং দেওয়ানি মামলার
জন্য ২০ টাকা ফিস জমা দিতে হয়।
ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে বিবাদ সংঘটিত হওয়ার ৩০দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট
ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করতে হবে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে বিরোধ
সৃষ্টি হওয়য়ার ৬০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিসদের চেয়ারম্যান
বরাবরআবেদন করতে হবে। তবে স্থাবর সম্পত্তি বেদখল হওয়ার দিন থেকে ১
বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। উপরোক্ত মামলা গ্রহন করার পর ইউনিয়ন
পরিষদ চেয়ারম্যান গ্রাম আদালত গঠনের পক্ষে প্রতিনিধি মনোনয়নের
জন্য নির্দেশনা দিলে আবেদনকারি ও প্রতিবাদি প্রত্যেকে ২ জন করে
প্রতিনিধি মনোনয়ন করবেন, যার মধ্যে ১ জন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য
এবং ১ জন স্থানীয় ব্যক্তি থাকতে হবে। ফৌজদারি মামলায় শিশু এবং
দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় মামলার ক্ষেত্রে নারীর স্বার্থ জড়িত থাকলে
সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অবশ্যই ১ জন নারী প্রতিনিধি মনোনযন করতে হবে।
আর সেই প্রতিনিধি হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন করতে
হবে যিনি গ্রাম আদালতের শুনানির দিন উপস্থিত থাকতে পারবেন এবং
সময় দিতে পারবেন। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট )।
এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব। তারিখ: ০৮ /
০৬ /২০২৬.