সুন্দরগঞ্জে ঝড়ে লণ্ডভণ্ড দহবন্দসহ ছয় ইউনিয়ন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন বহু এলাকা

হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ে পৌরসভাসহ ছয়টি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের আঘাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, দোকানপাট, গাছপালা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ঝড়ে অন্তত পাঁচ শতাধিক বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার দিবাগত রাতে উপজেলার তারাপুর, দহবন্দ, শান্তিরাম, সোনারায়, বামনডাঙ্গা, বেলকা ইউনিয়ন এবং সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ওপর দিয়ে তীব্র কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। আকস্মিক এই ঝড়ে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকা। উপড়ে পড়ে শত শত গাছপালা, ছিঁড়ে যায় বিদ্যুতের তার এবং ভেঙে পড়ে বিদ্যুতের খুঁটি।

দহবন্দ ইউনিয়নের দক্ষিণ ধুমাইটারী গ্রামের লিটন মিয়া জানান, রাত প্রায় ৩টার দিকে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকটি বড় গাছ তার একমাত্র বসতঘরের ওপর উপড়ে পড়ে। এতে ঘরটি মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং তিনি পরিবারের আরও তিন সদস্যসহ ঘরের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে ঝড় থেমে গেলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তারা প্রাণে রক্ষা পান। এ ঘটনায় লিটন মিয়ার একটি হাত ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, আমার একমাত্র থাকার ঘরটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। ঝড়ে সুন্দরগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫ বছরের পুরোনো একটি বিশাল বটগাছ উপড়ে বিদ্যালয় ভবনের ওপর পড়ে। এতে প্রধান শিক্ষকের কক্ষসহ অন্তত পাঁচটি কক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আসবাবপত্র, আলমারি, র‌্যাক, টেবিল-চেয়ার, ল্যাপটপ ও প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যালয় সংলগ্ন তিনটি বিদ্যুতের খুঁটিও ভেঙে পড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ক. জ. ম. হাবিবা বেগম বলেন, “কালবৈশাখী ঝড়ে অল্পের জন্য নৈশপ্রহরী প্রাণে রক্ষা পান। প্রধান শিক্ষক কক্ষ, সহকারী প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, শিক্ষক মিলনায়তন ও করণিকের কক্ষসহ বিভিন্ন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।” তিনি দ্রুত প্রশাসনিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের দাবি জানান।

দহবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল ইসলাম সরকার রেজা বলেন, আমাদের ইউনিয়নে শতাধিক বসতঘর ও দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে বা ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।

উপজেলা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত গাছপালার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সহায়তায় তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

ঝড়ে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. আব্দুল বারী জানান, ঝড়ে অন্তত ১২টি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে এবং আরও প্রায় ১০টি খুঁটি হেলে পড়েছে। এছাড়া ৩০টিরও বেশি স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেছে। তিনি বলেন, সকাল থেকেই ২১টি টিম মাঠে কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দ্রুত প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। ঈদের আগে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ অত্যন্ত দুঃখজনক।