ফেলে আসা দিনগুলো- ৬৯

এবাদত আলী

আনন্দ ভ্রমণের তৃতীয় দিনে অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ খিস্টাব্দ তারিখে টেকনাফে অবস্থানকালে
টেকনাফে বসবাসকারি রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবনধারা সম্পর্কে জানার কৌতুহল জন্মে। এই রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবন বড়ই বিচিত্র। মেয়েরা তাঁত বোনে। দোকানের সেলসম্যান হিসেবে সওদা বিক্রি করে। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার বড়ই অদ্ভুত। এদের ধর্মের প্রচলিত নিয়মানুসারে প্রত্যেক পুরুষ সদস্যকে বিয়ের আগে যে কোন সমং (সাত বছরের অধিক বয়সি) প্রবাজিত হয়ে শ্রমন জীবন (মংশাবাওয়াহ) গ্রহণ করতে হয়। সে কারনে কেয়ায়ং অর্থাৎ সাত দিন বৌদ্ধ বিহারে অবস্থান করতে হয়।
কেউ যদি ধর্মীয় এই দীক্ষা গ্রহণ না করে বিয়ে করে তাহলে তাকে এবং তার অভিভাবককে সমাজে সমালোচিত হতে হয়। রাখাইন সম্প্রদায়ের মৃতদেহ সৎকার অনুষ্ঠানে আনন্দ উল্লাস করা হয়। যে কোন লোক মারা গেলে মৃতদেহ দু’এক দিনের মধ্যে সৎকার করে। কিন্তু ধর্ম গুরু বা ভিক্ষু মারা গেলে তাদের মৃতদেহ এক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত রাখা হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। অতি প্রাচীন এই পদ্ধতিতে কাঠ দ্বারা বাক্স (সবাধার) এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে বাক্সটি নিছিদ্র থকে এবং ভিতরে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। বাক্সের তালায় প্রথমে সাধারণ কয়লা এবং তার উপরে ক্রমান্বয়ে চুন ও তামাক পাতা রাখা হয়। এর একটু উপরিভাগে কাঠের একটি ফ্রেম তৈরি করে তাতে ভিক্ষুর মৃতদেহ রাখা হয়। মৃতদেহ থেকে নির্গত তরল পদার্থ চুষে নেয়ার জন্য কয়লা চুন ও তামাক পাতা রাখা হয়। এই মৃতদেহের অন্তেষ্টি ক্রিয়া উপলক্ষে বিরাট উৎসব মেলার আয়োজন করা হয়। অতঃপর আনন্দ উৎসবের মাঝে চিতায় দেহ ভষ্ম করা হয়।
যাক আমরা এক সময় টেকনাফ সমুদ্র সৈকতে পৌঁছলাম। কক্সবাজার সমৃদ্র সৈকত আর টেকনাফ সমৃদ্র সৈকতের মধ্যে পার্থক্য তেমন কিছু নেই বল্লেই চলে। তবে এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় এখানে পর্যটকের সংখ্যা তুলসার্মলকভাবে অনেক কম। সোনালী রোদে সমৃদ্রের ফেনা চিক চিক করছে। এখানেও সমৃদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে পদতলে। বেশ কিছু সময় ধরে এমন দৃশ্য উপভোগের পর আমরা টেকনাফ বাজারে ফিরে এলাম। নাফ নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত এই বাজারটিতে তেমন কোন ভলো হোটেল নেই। সবটেচয়ে এখানে পানীয় জলের কষ্ট অত্যাধিক। এখানে চার’শ পাচ’শ ফুট মাটি না খুঁড়লে কোন সুপেয় পানি পাওয়া যায়না। যার দরুন এখানকার প্রায় জমিই এক ফসলী। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য সেবা, পুষ্টি পরিবেশসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মসূচী টেকনাফে বিরল। যার ফলে
এখানে শিশু মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি। নিরাপত্তাহীনতা টেকনাফের একটি আলোচিত সমস্যা। পার্শ¦বর্তী রাষ্ট্র মায়ানমার হতে বর্মী নাসাকা বাহিনী এসে প্রায়ই স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ চালায়। তারা নাফ নদী থেকে মৎস্য শিকারিদের ধরে নিয়ে যায়। সেই সাথে লুটতরাজ করে নৌকা ও মালামাল। কোনসময় প্রতিবাদ করলে গুলি করে প্রাণহানী ঘটায়।
আমরা টেকনাফ মার্কেটে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম। বার্মিজ স্যু, রাখাইন সম্প্রদায়ের তাঁতে বোনা বিছানার চাদরসহ কিছু দ্রব্য সামগ্রি তুলনার্মলকভাবে বেশ সস্তা। মার্কেটটিতে চোরাচালানের দ্রব্যে ঠাসা। বিশেষ করে বিদেশী মদ ও সিগরেটের মূল্য অত্যান্ত কম। টেকনাফ চোরাচালানের একটি প্রধান ঘাঁটি। রাতের আাঁধারে প্রতিবেশি রাষ্ট্র মায়ানমার হতে কোটি কোটি টাকার দ্রব্যাদি চালান হয় টেকনাফ সীমান্তে। এখান থেকে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের বাজারে। এসব কাজ বড় বড় রাঘব বোয়ালসহ স্থানীয় প্রশাসন সহায়ক ভুমিকা পালন করে বলে অপবাদ রয়েছে।
দীর্ঘক্ষণ ঘুরাঘুরির পর এবার আমাদের ফিরবার পালা। সকলেই কোচের সিটে গিয়ে আসন গ্রহণ করার পর আবার আঁকা বাঁকা সড়ক পথ ধরে ফিরে চলা এবার চট্ট্রগ্রামে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো অন্যখানে। আগেভাগে হোটেলে সিট বুক না করায় সেখানে সিট পাওয়া দুষ্কর। চট্টগ্রামে ফিরে গরু খোঁজার মত খুঁজে খুঁজে অবশেষে দুবাই নামক একটি হোটেলে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা হলো। কথায় বলে ফোটায় ঠকলে ঘড়াভরে ঢাললেও নাকি শোধ যায়না। আমাদের অবস্থাও যেন তাই। আমরা পরিশ্রান্ত এবং ক্লান্ত দেহে হোটেলে উঠেই সামান্য সময় বিশ্রাম নিয়ে খাবার পর্ব সমাধা করে সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। খুব ভোরে উঠতে হবে। কারণ আমাদের পরবর্তী নিশানা রাঙ্গামাটি।
পরদিন খুব ভোরে উঠেই তাড়াহুড়ো করে নাস্তা পর্ব সমাধা করেই বেরিয়ে পড়া। বন্দর নগরি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ চৌমুহনীর হোটেল দুবাই থেকে সকাল সাতটায় বেরিয়ে পড়া। আমাদের কোচ আবার ছুটে চল্লো সামনের দিকে। নাসিরাবাদ ২ নং রেল গেট পার হয়ে হাটহাজারি। হাটজাজারি থেকে রাউজান পৌরসভা। এরপর বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এই কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন। পাশেই পুলিশ স্টেসন ও ট্রেনিং সেন্টার।আমরা যতই সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি ততই পাহাড় চোখে পড়ছে। সুবিশাল পাহাড়ের রাজ্য যেন আমাদেরকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এপথে চলতে গিয়ে কেউ কবি না হলেও তার মনে কবিতার ভাব জন্মে। পাহাড়ের হাতছানিতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে মন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো এ পথে চলতে গিয়েই গেয়েছিলেন সেই বিখ্যাত গান “ গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ আমার মন ভুলায়রে।” রাঙ্গামাটির পথে পথে পাহাড় আর পাহাড়। বাংলাদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ এই পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির আয়তন প্রায় ৬.১১৬ বর্গ কিলোমিটার। লোক সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। রাঙ্গামাটির মোট ১০ টি থানা যথাঃ রাঙ্গামাটি, বরকল, কাউখালি, বাঘাইছড়ি, জুড়াইছড়ি, লংদু, নুনেরচর, কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলি। এ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের তলদেশে এঁকে বেঁকে বেয়ে গেছে শংখ, কাশালং, রানখিয়া ওকর্নফুলী নদী। রাঙ্গামাটি জেলার কোথাও কোন সমতল ভুমি আছে কিনা তা ভাবা বড়ই মুশকিল। এ জেলায় যারা বসবাস করে তাদের অধিকাংশই পাহাড়ী ও আদিবাসী। এ জেলায় বাস করে চাকমা, টিপরা কুকি। এই কুকিরা বাস করে জেলার সাজেক ভেলি অঞ্চলে। এই অঞ্চলে আরো বাস করে লুসাই উপজাতি। অপর একটা জাতি আছে তার নাম
তনচংগা। এই সকল উপজাতি জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের জোগান দিতে পাহাড়ের গায়ে জুম চাষ করে।এসব এলাকার লোকেরা পাহাড়ের গায়ে বনজঙ্গল কেটে এবং আগুন দিয়ে লতাগুল্ম ও ঝোপজঙ্গল পুড়িয়ে পরে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে চাষাবাদ করে থাকে। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ১৯/০৫/২০২৬.