ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায়ের বিদায়: বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী ও আমাদের অবিনাশী ঋণ স্মৃতির মিছিলে এক সাহসী নাম

জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
মরণের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আজ আমরা যাকে বিদায় জানালাম, তিনি কেবল একজন সাধারণ নারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের স্বাধীনতার এক জীবন্ত দলিল। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামের নিভৃত পল্লীর বাসিন্দা বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী গত ১২ মে রাতে পীরগঞ্জ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁর এই প্রস্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক দীর্ঘ এবং যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে ত্যাগের বিনিময়ে তিনি আমাদের একটি মানচিত্র উপহার দিলেন, আমরা কি তাঁকে যোগ্য প্রতিদান দিতে পেরেছি?
১৯৭১ সালের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন টেপরী রাণী। হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে তাঁর ওপর নির্যাতনের মাত্রা ছিল আরও ভয়াবহ। সম্ভ্রম হারিয়েও তিনি হার মানেননি। তাঁর ৫৪ বছর বয়সী পুত্র সুধীর রায় সেই যুদ্ধেরই এক ক্ষতবিক্ষত স্মৃতি, যাকে সমাজ ‘যুদ্ধশিশু’ হিসেবে চেনে। সেই প্রতিকূল সময়ে যখন সমাজ বীরাঙ্গনাদের বাঁকা চোখে দেখত, তখন টেপরী রাণী মমতাময়ী মায়ের হাত দিয়ে সেই সন্তানকে আগলে রেখেছেন। তাঁর এই মাতৃত্ব এবং লড়াই কোনো অংশেই সম্মুখ সমরের যোদ্ধার চেয়ে কম ছিল না।
প্রথাগতভাবে আমরা অনেক সময় বীরাঙ্গনাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে দ্বিধা করেছি। তবে আনন্দের বিষয় এই যে, টেপরী রাণীকে বিদায় জানানো হয়েছে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া ‘গার্ড অব অনার’ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখন বীরাঙ্গনাদের বীর মুক্তিযোদ্ধার সমান্তরালে মর্যাদা দিচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার খাদিজা বেগম ও অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছে। তবে এই সম্মান প্রদর্শন যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি বীরাঙ্গনার বেঁচে থাকার লড়াইয়েও প্রতিফলিত হয়।
টেপরী রাণীর জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে চরম অর্থকষ্টে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর তাঁরা স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের এই বীর নারীর মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের চারপাশে আজও এমন অনেক টেপরী রাণী অবহেলায় ও বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছেন। তাঁদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন, পর্যাপ্ত ভাতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো সময়ের দাবি। বীরাঙ্গনারা কেবল সহযোদ্ধা নন, তাঁরা আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর।
বীরাঙ্গনা টেপরী রাণীর প্রয়াণে পুরো ঠাকুরগাঁও জেলা আজ শোকাভিভূত। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যে গভীর শোক প্রকাশ করেছে, তা যথার্থ। তবে শোক প্রকাশের পাশাপাশি আমাদের শপথ নিতে হবে যেন তাঁর উত্তরসূরি এবং তাঁর মতো যোদ্ধাদের পরিবারগুলো সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারে। তাঁর পুত্র সুধীর রায়ের মতো যারা যুদ্ধের করুণ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আরও জোরালো হওয়া উচিত।
বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী চলে গেছেন, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এক অপরাজেয় লড়াইয়ের গল্প। স্থানীয় শ্মশানে তাঁর দেহ ছাই হয়ে গেলেও তাঁর ত্যাগের ইতিহাস আমাদের হৃদয়ে অম্লান থাকবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই বীরত্বগাঁথা পৌঁছে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন আমাদের স্বাধীনতার সূর্যসন্তান হয়ে।

আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—টেপরী রাণীর ত্যাগ যেন পাঠ্যপুস্তকের পাতায় এবং ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকে।