ফেলে আসা দিনগুলো- ৬২

এবাদত আলী
আমার বাল্য বন্ধু ও সহপাঠি স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। পাবনা জেলা শহরের আর,এম, একাডেমীর (রাধানগর মজুমদার একাডেমী) ছাত্র ছিলাম আমরা। আমাদেও দুজনের ভাব ছিলো অন্তর জোড়া। নবম শ্রেণিতে পদার্পণের পর আমাদের মাঝে প্রাচীর উঠলো যেন। তোজাম্মেল বিজ্ঞান বিভাগে আর আমি কলা বিভাগে। ক্লাশ রুম পৃথক হলো কিন্তু ছাড়াছাড়ি হয়নি সম্পর্কের।
সেবারই আর,এম, একাডেমী হতে প্রথম বার্ষিকী বের করার প্রস্তুতি চলে। প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক, সহকারী শিক্ষক জহুরুল হক এবং আমাকে বার্ষিকী সম্পাদনার যৌথ দায়িত্ব দেন। বন্ধু তোজাম্মেল হককে পরিষদের সদস্য হিসাবে আমার পাশেই রাখলাম। আসলে বাল্যকালে প্রতিভাধর ও সুদর্শন বন্ধুকে কেউ ই কাছ ছাড়া করতে চায়না। বার্ষিকীতে ওর একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো। কবিতার নাম ছিলো “জাগরণী”। যার শুরুটা ছিলো এভাবে
“রণ হুংকারে কাঁপে থর থর
পবিত্র মাতৃভূমি।”
১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হতে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মাতৃভূমির প্রতি তার মমত্ববোধ ফুটে উঠেছিলো তার কবিতায়। ১৯৬৬-৬৭ সালে আর,এম, একাডেমী হতে প্রকাশিত বার্ষিকীর কবিতা এবং বার্ষিকী সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসাবে আমার পাশে বন্ধু তোজাম্মেল হকের হাস্যোজ্জল সেই ছবি আজো আছে। যা দেখে মাঝে মধ্যেই আমি সেই সোনালী অতীতে হারিয়ে যাই। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ তোজাম্মেল হকের কথা মনে হলেই আমি কেমন যেন হয়ে যাই।
আসলে স্বজন কিংবা বন্ধুজন হারানোর ব্যথা মানুষ সহজে ভুলতে পারে না; ভোলা যায় না। ১৯৬৮ সালে আমরা এইচ,এস,সি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হলাম। তোজাম্মেল চলে গেল রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, আর আমি এডওয়ার্ড কলেজেই রয়ে গেলাম।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১ এর অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন সময় পর্যন্ত ও তোজাম্মেল হকের সাথে যোগাযোগ ছিল। মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে অংশ নিতে হতে পারে এমন কথাবার্তাও হয়েছিলো মার্চের উত্তাল আন্দোলনের সময়। ১০ এপ্রিল ‘৭১ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বিতীয়বারের মত নগরবাড়ী ঘাট হয়ে পাবনায় প্রবেশ করে। স্থানীয় দালালদের সহায়তায় তারা গণহত্যা, লুটপাট., নারী ধর্ষষ ও অগ্নি সংযোগ চালাতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষনের পর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। এরপর তোজাম্মেল হকের সাথে আর সাক্ষাৎ হয়নি। স্বাধীনতা লাভের পর জানতে পারলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সূর্য উদিত হবার মাত্র ৪ দিন আগে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ লড়াইয়ে তোজাম্মেল শহীদ হয়েছে। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চত্বরে বি,আই,টি’র প্রধান ফটকের পশ্চিম পাশে তার কবর রয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হককে নিয়ে লেখা লেখি করবো এমন অভিপ্রায় আমার ছিলোনা বল্লেই চলে। বন্ধু হারানোর দহন জ্বালা বুকেই চেপে রেখেছিলাম এতদিন। কিন্তু তার ভাতিজা ইঞ্জিনিয়ার এমদাদুল হক রঞ্জু একদিন এসে আমার সঙ্গে পরিচয় করে জানালো যে তার চাচার নাম মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত তালিকা বা গেজেটে অšতর্ভুক্ত হয়নি। আমার সহপাঠি বন্ধু ও সহযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় এবং তোজাম্মেল হকের পরিবারকে শহীদ পরিবার হিসাবে ঘোষণা না করায় আমি দারুনভাবে ব্যথিত হই।
রঞ্জুর অনুরোধে আমরা সেদিন ১৭ এপ্রিল ২০০০ সকালে পাবনা ৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কে,এম,আনোয়ারল ইসলাম, দৈনিক চাঁদনী বাজার পাবনা ব্যুরো পরিচালক এইচ,কে,এম, আবু বকর সিদ্দিক, ভাতিজা রঞ্জুসহ উক্ত সংসদ সদস্যের জিপে করে রাজশাহী রওনা হলাম। সাবেক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। বাংলাদেশ ইনিষ্টিটিউট অব টেকনোলজি (বি,আই,টি) রাজশাহীতে পৌছলাম। বি,আই,টির গেট দিয়ে ঢুকতেই বাম পাশে চোখে পড়লো শহীদ তোজাম্মেল হকের সমাধিস্থল। একই বেষ্টনীতে তিনটি কবর। চারদিকে উলুখড়। কবরের বেষ্টনীর মাঝে ঘন ঝোপ জঙ্গল লতা পাতায় যেন জড়াজড়ি করে রয়েছে। কোন সময় কেউ হয়তো ভুলেও কবরের পাশে গিয়ে দাড়াবার তেমন প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি বলেই মনে হলো।
ভাঙ্গা চোরা খাল বাকলা ওঠা বেষ্টনীর গায়ে মাঝখানে খোদাই করে লেখা রয়েছে শহীদ তোজাম্মেল হক, পিতা: ময়েন উদ্দিন, দাদপুর, পাবনা। শহীদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন। একপাশে রয়েছে শহীদ আবু জাফর শওকত রেজা, পিতা: আব্দুল হামিদ, দরগাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনা। জন্ম ১৯৪৮ সন। শহীদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন। অপরজন শহীদ আমিনুর রহমান, পিতা: হাবিবুর রহমান, দামুদ্যা, ফরিদপুর। শহীদ ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন।

তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরে বেড়ে উঠেছে বেশ কিছু গাছ পালা। বড় একটি শিমুল গাছ শির উচু করে দাড়িয়ে আছে। গাছ থেকে সদ্য ফোটা তুলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কবর সহ আশে পাশে। আমরা কবর জিয়ারত শেষে বিআইটির পরিচালকের সাথে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় মহাবিদ্যায় গুলোতে যেমন ছাত্র নেতৃত্বে টানা পোড়েন, ভেবেছিলাম বিআইটি তার ব্যতিক্রম হবে। কিন্তু এখানকার পরিবেশও ছাত্র রাজনীতি মুক্ত নয়। পরিচালকের কক্ষে তখন এক গাদা ছাত্রের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছিলো।
এক সময় ঝঞ্ঝাট মুক্ত হলে আমরা পরিচালক প্রফেসর জি,এম, হাবিবুল্লার সাথে সাক্ষাৎ করে শহীদ তোজাম্মেল হক সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি সাথে সাথে ফোনের রিসিভার তুলে ফোন করলেন রেজিস্টারের কাছে। রেজিস্টার এলেন। আলাপ পরিচয় পর্ব সমাধা অন্তে রেজিস্টার আমানুল ইসলাম অতি আগ্রহ ভরে ফোনে সহকারি রেজিস্ট্রারের সাথে কথা বলেন। সহকারি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) হাবিব উদ্দিন আহমদ এসে তোজাম্মেল হকের কথা শুনে আবেগ আপ্লুত কন্ঠে বলেন তোজাম্মেলকে আমি চিনতাম; আমার দপ্তরে তার সকল বৃত্তান্ত রয়েছে। আমরা তার দপ্তরে গেলাম। খুজা-খুজি শুরু হলো। অনেক্ষন ধরে খুজা-খুজির পর প্রায় ৩০ বছর আগের রেজিষ্টার খানা পাওয়া গেল। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হকের সকল বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ রয়েছে তাতে।
নিয়ম মাফিক আবেদনের প্রেক্ষিতে সহকারি রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রারের সহযোগীতায় বিআইটির রাজশাহীর পরিচালকের নিকট হতে শহীদ তোজাম্মেল হকের অনুকুলে একখানা প্রত্যয়ন পত্র পাওয়া গেল। এই প্রত্যয়ন পত্র বলেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তোজাম্মেল হকের নাম মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের তালিকা ভূক্ত হবে এবং তার পরিবারও পাবেন শহীদ পরিবারের মর্যাদা। পাশাপাশি বিআইটি রাজশাহী ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা তোজাম্মেল হক সহ অন্যান্য শহীদদের কবরের সংস্কার করা হলে শহীদদের পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। (ক্রমশঃ) (লেখক; সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি.
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব, ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ; ২৬/০২/২০২৬