এবাদত আলী
না এ নছিমন- করিমন কারো ঘরের বউ ঝি নয়। কোন সিনেমা কিংবা যাত্রা গানের নায়িকাও নয়। তবুও নাম তার নছিমন, নাম তার করিমন। এই নছিমন- করিমন এক প্রকার যানবাহন। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় নছিমন- করিমন। কেউ কেউ বলে ভটভটি। নছিমন-করিমন ইঞ্জিন চালিত যাত্রিবাহী বা মালবাহী গাড়ি। যা গ্রাম বংলার খেটে খাওয়া দিন মজুর ও সাধারণ মানুষের বাহন।
প্রায় অটো ট্যাম্পুর ন্যায় বডি তৈরি করে তিন চাকা বিশিষ্ট এই বাহনটিতে শ্যালো ইঞ্জিন কিংবা মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন ও হ্যান্ডেল সংযোজন করে স্থানীয় ভাবে তা প্রস্তুত করা হয়েছে। যতদুর জানা যায়, বগুড়া জেলার শেরপর উপজেলায় সর্বপ্রথম এই তিন চাকা বিশিষ্ট বাহনটি তৈরি করা হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন শহর, শহরতলী ও গ্রাম- গঞ্জের আনাচে কানাচে তা ছড়িয়ে পড়ে। নব প্রযুক্তির এই যান দুটির নাম কেন যে নছিমন- করিমন রাখা হয়েছে তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়না। তবে অনেকের মতে গ্রামাঞ্চলে নছিমন নামক এক ধরনের যাত্রা পালা প্রদর্শন করা হতো। সে যাত্রা দলের কোন লাইসেন্স বা রেজিষ্ট্রেশন ছিলনা। আজ এ গাঁয়ে কাল ওগাঁয়ে দলবল নিয়ে পালা গেয়ে বেড়াতো। গোঁফ- দাড়ি না ওঠা ছোকরা কিংবা মাকুন্দা কোন কিশোরকে শাড়ি-ব্লাউজ কিংবা সালোয়ার কামিজ পরিয়ে মাথায় পরচুলা লাগিয়ে বুকে স্পঞ্জ যুক্ত ব্রেসিয়ার বেঁধে নায়িকা সাজাতো, সাজাতো দাসি বাঁদী। হারমোনিয়াম, ফ্লুয়েট বাঁশি, মন্দিরা, ঢোলক, খোল ও করতাল বাজিয়ে উন্মুক্ত মঞ্চে নছিমন যাত্রা গান গাওয়া হতো। গানের তালে তালে নছিমন যাত্রা পালার প্রায় সবটুকু অংশ জুড়েই থাকতো নাচ। স্থানীয় ভাবে প্রচলিত গানের সুরে সুর মিলিয়ে অতি সহজ ও সরল ভাষায় তারা রাত ভর পালা গান গাইতো। এ গানের বেশীর ভাগ শ্রোতাই হলো অজ পাড়াগাঁয়ের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তাই ঐ সকল শ্রোতাদের জন্য কোন ফরাশ পাতা হতোনা, হতোনা কোন দামি সতরঞ্চি বিছানো। খড়-বিচালির ওপর বসে কিংবা পায়ের স্যান্ডেল পেড়ে বসে তারা রাত ভর নছিমন গানের পালা শুনতো ও কিশোরি রূপি বালকদের কোমর দুলানো নাচ দেখে বিমোহিত হতো। পক্ষান্তরে নছিমন –করিমন গাড়ির ও কোন জৌলুস নেই, নেই সিটের সঙ্গে নরম গদি আঁটা। নছিমন করিমনের কোন লাইসেন্স নেই,-নেই রুট পারমিট। সড়ক মহাসড়ক কিংবা কাঁচা রাস্তায় অবাধে চলাচল করতে পারে। এই নছিমন- করিমনের অধিকাংশ যাত্রিই গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ। বাসের যাত্রিরা যেমন বাসের ছাদে “মফিজ” হয়ে যাতায়াত করে এই নছিমন-করিমন এর যাত্রিরাও ঠিক তেমনি ভাবে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এতে অবাধে যাতায়াত করে থাকে। আমাদের সমাজ জীবনে নছিমন যাত্রা যেমন অবহেলিত তেমনি এ ধরনের যানবাহনও অবহেলিত। তাই হয়তো বা কেউ তাচ্ছিল্য¬ ভরে এ ধরনের যানবাহনের নাম করন করেছে নছিমন। তবে করিমনের নাম এসেছে নছিমনের ছোট বোন হিসাবেই? এ ছাড়া নছিমনের চেয়ে আকার আকৃতিতে একটু বড় একই ধরনের বাহনকে বলা হয় আলম সাধু। এ নামেরও কোন আভিধানিক তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়না। বিকট শব্দে ভট ভট করে চলে বলে নছিমন, করিমন ও আলম সাধু যানবাহনকে লোকে ভটভটিও বলে থাকে। এই ধরনের আরো কিছ যান বাহন আছে যার নাম রিামন, রহিমন, আলগা মন, গ্রামবাংলা ও লটা হাম্পার, কুত্তা গাড়ী প্রভৃতি।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই দেশের কৃষি ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়নের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশ থেকে শ্যালো ইনঞ্জিন আমদানি করে তা অতি সল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করে। এতে কৃষক কুলের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগে। শ্যালো ইঞ্জিন দ্বারা অতি সহজেই জমিতে পানি সেচ করে তারা অধিক ফসল উৎপন্ন করেতে সক্ষম হয়।
কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই পদ্মা নদীর উজানে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পানি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অধিক নিচে নেমে যাওয়ার ফলে শ্যালো ইঞ্জিনে পানি সেচের মাধ্যমে আর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়না। বলতে গেলে এ সকল ইঞ্জিন অব্যবহ্রত হয়ে পড়ে। কিছু কিছু কৃষক বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষামূলক ভাবে ঐ সকল ইঞ্জিন নৌকায় লাগিয়ে নৌকার গতি বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়। মান্ধাতা আমলের গুন টানা, দাঁড় টানা কিংবা লগি ঠেলা থেকে তারা রেহাই পায়। ফলে দেশের প্রায় সকল নৌকাতেই শ্যালো ইঞ্জিন লাগিয়ে তার গতি দ্রুততর করার প্রতিযোগিতা চালু রয়েছে। এ দিকে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য সরকার বিদেশ থেকে পাওয়ার টিলার বা কলের লাঙল আমদানি করলে কৃষকগণ তা দিয়ে অতি অল্প সময়ে এবং কম খরচে জমি চাষ করে সুফল পেতে শুরু করে। কিন্তু জমি চাষের মৌসুম শেষ হলে ঐ সকল পাওয়ার টিলার অযতœ অবহেলায় যত্র তত্র ফেলে রাখা হতো। কিছু কিছু কৃষক ঐ ইঞ্জিনকে পাম্পে লাগিয়ে পানি সেচ এবং ধান ভাঙানোর কাজে ব্যবহার করতে থাকে। আবার কেউ কেউ স্থানীয় প্রযুক্তিতে চার চাকা বিশিষ্ট ট্রলি তৈরি করে কৃষি পন্য বহনের ব্যবস্থা করে।
পাবনা সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পাওয়ার টিলারের ট্রলি ব্যবসা জম- জমাট হয়ে ওঠে। এক দিকে পাওয়ার টিলার অপর দিকে নছিমন-করিমন, আলম সাধু বা ভট ভটি লটা হাম্পার, কুত্তা গাড়ি ইত্যাদি পাকা সড়কে অবাধে চলাচল করতে থাকে। নছিমন-করিমন আর আলম সাধু যাত্রি সেবায় মেতে ওঠে, পাওয়ার টিলার মালামাল পরিবহনে তৎপর হয়। সল্প দুরের যাত্রা পথে যাত্রি সাধারণকে আর বাসের জন্য অধিক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়না। কিংবা বাসে চড়ে যাত্রীগণকে আর ভিড়ের মাঝে চিড়াচেপ্টা হতে হয়না।(ক্রমশঃ) (লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য, পাবনা প্রেসক্লাব।
