সাংবাদিকতার চার যুগ- ২৩

এবাদত আলী
পাবনা জেলাধীন সাঁথিয়া উপজেলার করমজা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মন্তাজ আলী চতুর। পিতা মোমিন উদ্দিন ছেলের বুদ্ধিমত্তার কারনে ছেট বেলা আদর করে ডাকতেন চতুর আলী বলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসল নাম চাপা পড়ে যায়। লোকে বলে চতুর আলী। বিদ্যার দৌড় অষ্টম শ্রেণি হলেও তার বদ্ধিমত্তার তারিফ করেন এলাকাবাসী। চতুর আলী উদোগ নেন একটি নিরাপদ উড়োজাহাজ তৈরির। যে কথা সেই কাজ। নিরাপদ উড়োজাহাজের নকশা হিসাবে একজন চালক ও একজন আরোহি উঠতে পারবে তার উদ্ভাবনী উড়োজাহাজে। উড়োজাহাজটির নির্মাণ কৌশল এমন হবে যে, এর নিচের দিকে মোটর গাড়ির চাকা থাকবে এবং ব্যবস্থা থাকবে এর ডানা দুটি গুটিয়ে নেয়ার। প্রয়োজন হলে ডানা গুটিয়ে নিয়ে উড়োজাহজটি চালানো যাবে সড়ক পথে। আবার চালক বা আরোহি যদি মনে করেন যে, আকাশে কিংবা সড়ক পথে নয়, যানটি তিনি চালাবেন নদীতে; তাও পারবেন। উড়োজাহাজের সঙ্গে থাকবে পাল ও বৈঠা। এক কথায় বহুমুখি যান হিসাবে ব্যবহৃত হবে এই উড়োজাহাজ।
এ ঘটনা আশির দশকের শেষ দিকের। সে সময় তিনি করমজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। চতুর আলীর উড়োজাহাজ নির্মাণের কথা জানাজানি হলে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়। সাড়া পড়ে যায় সারা দেশে। চতুর আলীর বুদ্ধিমত্তার কথা যারা জানতেন তারা সহজেই বিশ্বাস করেন তার এই উদ্ভাবনীর কথা। তাদের ধারণা শুধু বিদ্যা দিয়েই সব কাজ হয়না বুদ্ধি দিয়েও হয়। কিন্তু এমন সব ধারণার লোকের সংখ্যা খুবই কম। কেউ কেউ বলতে থাকে চেয়ারম্যানকে অতি শিঘ্র হেমায়েত পুর পাঠাবার ব্যবস্থা করা হোক। কারণ ওখানে একটা সিট তার জন্য খালি পড়ে আছে। অনেকে আবার চতুর আলীর এ এক নতুন চাতুরি বলে বিষয়টাকে হেসেই উড়িয়ে দেয়। কিন্তু প্রশাসন? তৎকালিন উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি অর্থাৎ ইউ এন ও সাহেব বিষয়টি অতি গুরুত্বের সাথে আমলে নেন।
এ প্রসঙ্গে আমরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিউজ করি। অত্যন্ত গুরুত্বেও সাথে সেসব নিউজ ছাপা হয়। চারন সাংবাদিক মরহুম মোনাজাত উদ্দিন “চতুর আলী-চতুরালি ” শীর্ষক একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন“ সাঁথিয়া নেমে এদিকে ওদিকে যাই। আলাপ করি এলাকার কয়েকজনের সাথে। আসেন স্থানীয় সাংবাদিক ভাইয়েরা। তাদের কাছ থেকে প্রাথমিক কিছু তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করি। তার পর এক সময় ঢুকি ইউ এন ও সাহেবের কক্ষে। এ সময় দেখি, বেটে খাটো এক ব্যক্তি বসে আছেন ইউ এন ও র পাশের চেয়ারে। পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় তাকে আমার সাথে। তার নাম মন্তাাজ আলী চতুর। তিনি একজন ইউপি চেয়ারম্যান। ইউ এন ও জানান যে, খুব অল্প লেখা পড়া জানা লোক হলেও চতুর আলী একজন বৈজ্ঞানিক। তিনি একটি উড়োজাহাজ বানাচ্ছেন। উড়োজাহাজটির একটি নকশাও দেখালেন তিনি। দেখালেন কোথায় থাকবে চাকা, কোথায় ডানা, কোথায় বৈঠা- পাল ইতাদি। ইউ এন ও বলে¬ন বিশ্বাস করেন রিপোর্টার সাহবে, এই মিষ্টার চতুর আলী বাংলাদেশের বিরাট এক প্রতিভা। পৃথিবীর অন্য কোন দেশ হলে এই চতুর আলীকে নিয়ে টানা টানি শুরু হয়ে যেতো। উড়োজাহাজ সম্পর্কে আরো শুনতে চাই। প্রশ্ন করি নানানটা যন্ত্রপাতি কোথথেকে আসবে? কবে নাগাদ চালু হবে-বহুমুখি বিশেষ নিরাপদ যানটি। বানিজ্যিক ভিত্তিতে বানানো শুরু হবে কিনা? খরচ হবে
কত টাকা? এই সব। চতুর আলী জানান ৬/৭ মাসের মধ্যে উড়োজাহাজ বানানো শেষ হয়ে যাবে। তিনি ইনজিন হিসাবে ব্যবহার করবেন পুরাতন ভোক্সওয়াগনের একটি ইনজিন। সেটি ইতোমধ্যেই নাকি কিনে ফেলেছেন। উড়োজাহাজ বানানোর বাদ বাকি টাকা দিবেন ইউ এন ও সাহেব। উপজেলা প্রশাসন দেবে টাকা? বাহ!
হ্যাঁ, আমরাই দেবো।
বলেন কি?
দারুন ইন্টারেষ্টিং তো! ইউ এন ও সাহেব বলেন জেনে খূশি হবেন ইতোমধ্যেই তাকে আমরা উপজেলা তহবিল থেকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে দিয়েছি।
সাঁথিয়া থেকে ফিরে চতুর আলী ও তার উড়োজাহাজ সম্পর্কে দৈনিক সংবাদ এ লিখি। চতুর আলীর ছবি উড়োজাহাজের নকশা এ সব ও ছাপা হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন না। এটা কি হতে পারে? ক্লাস এইট পাশ একটা লোক উড়োজাহাজ বানাবে আর উপজেলা প্রশাসন তার পেছনে টাকার জোগান দেবে? না- না চতুর আলী না হয় চতুর, কিন্তু একজন ইউ এন ও কি করে হন অতো বোকা?
এ নিয়ে তখন অনেক লেখা লেখি হয়, কিন্তু কাজ হয়না। উড়োজাহাজের পাত্তা নেই। আর চতুর আলীকে অগ্রিম হিসাবে দেওয়া টাকাও আদায় হয়না। পাবনার তৎকালিন জেলা প্রশাসক একদিন সাঁথিয়া সফরে যান। তিনি চতুর আলীর ঘটনা তদন্ত করেন। উড়োজহাজ আবিষ্কার সম্পর্কিত ফাইলটি উপজেলা প্রশাসন থেকে নিয়ে দেখেন, আগাম টাকা দেয়ার প্রমানটি পান। তিনি তখন ক্রোধান্বিত হয়ে লাফাতে থাকেন। চতুর আলীকে গ্রেফতার করে পাবনা শহরে নিয়ে আসেন তিনি সে দিনই।”(পথ থেকে পথে-মোনাজাত উদ্দিন।)।
তখন সারা শহর জুড়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। পত্র পত্রিকায় লেখা লেখিতে যতটা না হয় কেউ থানা -পুলিশের হাতে গেলে তার চেয়ে দশ গুন জানা জানি হয়। পর দিন চতুর আলীকে কোর্ট হাজতে নিয়ে আসা হয়। হাজারো মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে উড়োজাহাজ আবিষ্কারক চতুর আলীকে এক নজর দেখার জন্য। কেউবা প্রশংসা করেন চতুর আলীর উদ্ভাবনী শক্তির, কেউবা নাক সিটকায়। কেউ বা বলে ওকে মেন্টাল হাসপাতালে এখনো পাঠানো হয়নি কেন?
এ ঘটনার তিন দিন পর হাজত থেকে ছাড়া পান চতুর আলী। সরকারি টাকা তাকে ফেরত দিতে হয়। চতুর আলীর নিরাপদ উড়োজাহাজ তৈরির আগ্রহে ভাটা পড়ে। কিন্তু এলাকায় তার জনপ্রিয়তার ভাটা কখনই পড়েনি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি করমজায় একটি বৃহৎ হাট প্রতিষ্ঠা করেন, যার নামকরণ করা হয় চতুর হাট। সে হাট টি এখনো আছে। কিন্তু সেই নিরাপদ উড়োজাহাজ আবিষ্কারক বৈজ্ঞানিক বীর মুক্তিযোদ্ধা চতুর আলী আর নেই। নতুন বিশ্ববার্তা পত্রিকার খবরে সাঁথিয়া প্রতিনিধির বরাত দিয়ে এব সময় এক সংবাদে বলা হয়, সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, করমজা হাটের প্রতিষ্ঠাতা মন্তাজ আলী চতুর আর নেই। তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। পরের দিন করমজা চতুর হাট প্রাঙ্গনে জানাযা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে স্থানীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭২ বছর।
উক্ত পত্রিকায় সংবাদটি পড়ার পর কৌতুহলী হয়ে সেই পুরনো দিনের উড়োজাহাজ আবিষ্কারের পরবর্তী ঘটনা জানতে চেয়ে আমার অনুজ প্রতিম সাংবাদিক সাঁথিয়ার মজিদ মোল্ল¬াকে ফোন করি। তিনি বলেন তিনি চতুর আলীর বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবার বর্গের সাথে আলাপ করে আমাকে বিস্তরিত জানাবেন। বিগত ২৪ ফেব্রুয়ারি-২০০৯‘ বিকাল বেলা মজিদ মোল¬ার ফোন পাই। কথা হয় তাঁর সাথে এবং উড়োজাহাজ আবিষ্কারক মরহুম চতুর আলীর ভাই আমিনুল মেকানিক্সের সাথে। আমিনুল জানান তার বড় ভাই চতুর আলী ছোট বেলা থেকেই খুবই বুদ্ধিমান ও চতুর ছিলেন,-তাই বাবা মা আদর করে তার নাম রেখেছিলেন চতুর আলী। তিনি জানান তার ভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় আর্টিলারী গ্রুপে ছিলেন। সেখান থেকেই উড়োজাহাজ তৈয়ার করার বিষয়টি তার মাথায় আসে। আমিনুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- উড়োজাহাজ তৈরি করতে ওয়েলডিং মেশিন লাগতো তখনকার দিনে তো আর যত্র তত্র ওয়েলডিং মেশিন পাওয়া যেতোনা। তিনি বলেন আমার ভাই ছিলেন মেকানিক্স, আমিও মেকানিক্স তাই আমাদের নিজস্ব ওয়েলডিং মেশিন ছিলো। উড়োজাহাজ তৈরির বিষয় তিনি জানান, তিনি ও ছিলেন তার ভাইয়ের সহযোগি হিসাবে। তখনকার দিনে প্রায় ১ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিলো। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম- উড়োজাহাজ তৈরির জন্য যে সকল যন্ত্রপাতি বা লোহা লক্কড় খরিদ করা হয়েছিলো তা অবশেষে কি করা হয়েছিলো? তার উত্তরে আমিনুল বলেন- তা ভাংড়ি হিসাবে বিক্রয় করা হয়েছে।(ক্রমশ ঃ) (লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য, পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ-০৬/১০/২০২৫