দুগ্ধ বা দুধ নিয়ে কিছু কথা

এবাদত আলী
দুগ্ধ বা দুধ শব্দের মূল অর্থ স্তন্যপায়ী প্রাণির স্তনগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত পুষ্টিকর সাদা রঙের তরল পদার্থ। গরু মহিষ, ছাগল ভেড়া কিংবা মানুষের মত স্তন্যপায়ী প্রাণি থেকে উৎপাদিত সাদা ও পুষ্টিকর পানীয়। সন্তান জন্মের পর মায়ের বুক থেকে নিঃসৃত মায়ের দুধ খাওয়নোর প্রচলন মানব সভ্যতার সুচনা বা মানব জাতির উৎপত্তির সময় থেকেই শুরু হয়েছে। মানব জাতির আদিমাতা হজরত হাওয়া (আলাইহিস সালাম) তাঁর সন্তানদেরকে নিজের বুকের দুধ পান করাতেন। ইসলামী ইতিহাস তফসির ও ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনা (যেমন ইমাম ইবনে জারির আত-তবারি রহঃ) এর বর্ণনা অনুযায়ী পৃথিবীতে আগমণ করার পর হজরত হাওয়া (আঃ) এর গর্ভে প্রতিবারে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান এভাবে জোড়ায় জোড়ায় সন্তান জন্ম নিতো। সন্তানরদের সাভাবিক লালন-পালন ও পুষ্টির জন্য তৎকালীন একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে তিনি নিজেই তাদেরকে নিয়মিত দুগ্ধদান করতেন। পৃথিবীর সুচনা লগ্নে হজরত হাওয়া (আঃ) ছিলেন পৃথিবীর প্রথম নারী এবং সমস্ত মানুষের গর্ভধারিনী মা। মহান রাব্বুল আলামিন মানব শিশুর জন্মের পর তার সর্বোত্তম পুষ্টির জন্য মায়ের বুকেই দুধের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। প্রথম মানব পরিবারের এই স্বাভাবিক নিয়মই কার্যকর ছিলো। পৃথিবীর সুচনালগ্নে হজরত আদম (আঃ) ও মা হাওয়া (আঃ) ছাড়া অন্য কোন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ বা ধাত্রী (দুধ মা ) ছিেেলন না। ফলে সন্তানদের দুধ পান করানোর একমাত্র উৎস ছিলেন আদি মাতা নিজেই। বিভিন্ন তথ্য ও সুত্র হতে জানা যায় তাঁর মোট সন্তান সংখ্যা ছিলো ৪০ জন। সকলকেই তিনি দুগ্ধ পান করিয়ে ছিলেন।
পরবর্তীকালে সন্তানদের মায়ের দুধের পাশাপাশি ছাগল এবং ভেড়ার দুগ্ধ পান করানোর প্রবনতা শুরু হয়। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে (খিস্টপূর্ব ৮ম থেকে ৭ম সহ¯্রাব্দে) নব্য প্রস্তর যুগে তা শুরু হয়েছিলো। গৃহ পালিত পশুর তালিকায় ছাগল এবং ভেড়া ছিলো মানুষের প্রথম পছন্দ। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া (বর্তমান তুরস্ক, ইরাক ও ইরান অঞ্চল) বা উর্বর ক্রিসেন্ট এলাকায় মানুষ প্রথম ছাগল ও ভেড়া পালন শুরু করে এবং এদের দুধ সংগ্রহ করা শেখে। ছাগল ও ভেড়ার পর মানুষ বন্য গরু গৃহপালিত করতে শুরু করে। প্রায় সাড়ে ৮ হাজার বছর আগে তুরস্ক এবং উত্তর-পশ্চিম আনাতোলিয়া অঞ্চলে উদ্ধার হওয়া প্রাচীন মাটির পাত্রে গরুর দুধের চর্বিও অবশিষ্টাংশ বা লিপিড পাওয়া গেছে যা প্রমাণ করে যে তখন থেকেই গরুর দুধের ব্যবহার শুরু হয়েছিলো। চার হাজার ৫শ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ অব্দে) সিন্ধু সভ্যতা এবং দক্ষিন এশীয় অঞ্চলে মূলত দুগ্ধজাত পন্যের জন্য মহিষ পালন শুরু হয়।
একটি মজার তথ্য হলো শুরুতে মানুষ কিন্তু কাঁচা দুধ হজম করতে পারতোনা। মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে বড় বয়সে দুধ হজম করার জন্য প্রয়েজনীয় এনজাইম ছিলোনা। ফলে প্রাচীন মানুষ প্রথম দিকে দুধকে দই, পনির বা মাখন বানিয়ে ল্যাকটোজের পরিমাণ কমিয়ে খেত। পরবর্তীতে মানুষের জিনগত পরিবর্তন ঘটে যার ফলে মানুষ প্রাপ্ত বয়ষ্ক হবার পর সরাসরি দুধ হজম করার সক্ষমতা অর্জন করে। শুষ্ক ও মরুভূমি অঞ্চলের মানুষ প্রাচীনকাল হতেই উটের দুধ খাদ্য হিসেবে পান করতো। খ্রিস্টপূর্ব ৩ হাজার বছর আগে আরব উপদ্বীপে উট গৃহপালিত প্রাণি হিসেবে লালন পালন করা শুরু হয়। মরুভূমির চরম বৈরি ও শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকার জন্য প্রাচীন যাযাবর বেদুইনরা উটের দুধ পানের প্রচলন শুরু করে। দীর্ঘ মরুযাত্রায় যখন খাবার ও পানির তীব্র সংকট দেখা দিতো তখন বেদুইন যাযাবররা উটের দুধ খেয়েই মাসের পর মাস বেঁচে থাকতো। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই প্রচলন উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামিক ইতিহাসেও উট ও দুম্বার দুধের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর যুগে এবং প্রাচীন আরবে উট ও দুম্বার দুধ এবং মাংস মানুষের প্রিয় খাবারের অংশ ছিলো। বিভিন্ন হাদিস শরীফেও উটের দুধকে ঔষধি গুণসম্পন্ন প্রতিষেধক হিসেবে পানের কথা উল্লেখ আছে।
সমগ্র বিশে^ ৬শ কোটিরও বেশি দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের গ্রাহক রয়েছে এবং এদের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিক। প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ গোপালক পরিবারে বসবাস করে। ভারত বিশে^র বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ হয়েও আমদানি রফতানি করেনা। নিউজিল্যান্ড, ই ইউ-১৫এবং অষ্ট্রেলিয়া হলো বিশে^র তিন বৃহত্তম দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য রফতানিকারী দেশ। চীন, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড,ইতালি, বেলজিয়াম, যক্তরাজ্য, স্পেন এবং জাপান হলো বিশে^র দশম বৃহত্তম দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য আমদানিকারী দেশ। উন্নয়নশীল দেশ গুলিতে পুষ্টি বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তায় দুধের অবদান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক উৎপাদন শিল্পে দুধ থেকে দই, ঘোল, ল্যাকটোজ, ঘন দুধ, গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য খাদ্যবস্তু এবং শিল্প পন্য উৎপাদন করা হয়। বহু সহ¯্রাব্দ ধরে মানুষের পক্ষে গরুর দুধ প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে আরো বিভিন্ন প্রকারের দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া থেকে দুধ পাওয়া গেলেও গরুর দুধের চাহিদা সর্বাধিক। একটি সুত্র থেকে জানা যায় বাংলাদেশে দুধের বার্ষিক চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ অনেক কম। দেশে উৎপাদিত দুধের বড় একটি অংশ ৮০ শতাংশের বেশি আসে ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষকদের কাছ থেকে। আমাদের দেশে ‘দুধে ভাতে বাঙালি’ বলে একটি প্রবাদ চালু আছে। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি সংস্কৃতিতে ভাত ও দুধকে পেটভরে খাওয়ার এবং সচ্ছলতার মাপকাঠি মনে করা হতো। মধ্য যুগের বিশিষ্ট কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত অন্নদামঙ্গল কাব্যে পাওয়া যায় ঈশ^রী পাটনী অন্নপূর্ণার কাছে এই বলে বর চেয়েছিলেন যে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ ছোটবেলা মায়ের হাতে মেখে দুধ-ভাত খাওয়ার স্মৃতি বাঙালির আবেগের সঙ্গে আজো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।