ছাতকে দলিল লিখক থেকে আওয়ামী লীগ নেতা, জাল দলিল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ক্যাডার বাহিনীর দাপটে এলাকাবাসী আতঙ্কে, একাধিক মামলায় আসামি—গ্রেপ্তারের দাবি

ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের ছাতকে দলিল লিখক থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা মাহমুদুল হাসান ওরফে সালিকের বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি, জমি দখল, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, হামলা-মামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিরোধপূর্ণ জমি দখল এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় একটি বলয় তৈরি করেন মাহমুদুল হাসান। ভাতগাঁও ইউনিয়নসহ ছাতক উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত ও স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং বিভিন্ন বিরোধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের আদেশের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর আইনগত অবস্থান নির্ধারণযোগ্য।

জাল দলিল ও প্রতারণার অভিযোগ ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নছরতপুর ওরফে বরাটুকা গ্রামের ডা. মোহাম্মদ সুহেল সুনামগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেন বলে জানা গেছে। মামলাটিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্ত হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে আনুজানি গ্রামের জহুর আলীর দায়ের করা মামলায় তিনটি কথিত ভুয়া দলিল তৈরির অভিযোগও সামনে এসেছে। মামলাটির তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে বলে সংশ্লিষ্টরাজানিয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মো. মিরাজ আহমেদ জানিয়েছেন, তদন্তকালে আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে মামলার চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে দলিল তৈরির বিষয়টি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। কারও জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে সেটি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি প্রকল্প ও সালিশকে ঘিরে অভিযোগ মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, টিআর-কাবিখা, টিসিবির কার্যক্রম এবং গ্রাম্য সালিশকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক কার্যক্রমে তার অনুসারীদের উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নথি ও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে থাকার সময় মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার প্রশ্ন ওঠে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন, প্রকল্প ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগটির প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
বিদ্যালয়ের অনিয়মের প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর নুরের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গাড়ি ভাঙচুরের মামলাতেও আসামি এছাড়া গত ৭ আগস্ট ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্টে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা দ্রুত বিচার আইনের মামলায়ও মাহমুদুল হাসান আসামি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন বিরোধকে কেন্দ্র করে তার অনুসারীরা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন। কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা, মামলা কিংবা সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা হতো বলেও কয়েকজন দাবি করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি ঘটনার পৃথক তদন্ত এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে।

আতঙ্কে এলাকাবাসী, গ্রেপ্তারের দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা অনেক বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও তার বিরুদ্ধে যদি ফৌজদারি অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা উচিত। তারা মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পুলিশের বক্তব্য মাহমুদুল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জালিল বলেন, আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। একই সঙ্গে যেসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যেসব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাবে না, সেগুলো থেকেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

সেখানে “জাল দলিল”, “চাঁদাবাজি”, “আত্মসাৎ”, “ক্যাডার বাহিনী” ইত্যাদি শব্দকে সরাসরি প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে না লিখে অভিযোগ হিসেবে রাখা হয়েছে। প্রকাশের আগে সম্ভব হলে মামলার নম্বর, ধারাসমূহ, অভিযোগপত্রের তথ্য, আদালতের জামিন আদেশ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মিলিয়ে নিলে প্রতিবেদনটি আরও শক্ত ও আইনগতভাবে নিরাপদ করার দা‌বি।