সাংবাদিকতার চার যুগ –৩৭

এবাদত আলী

সাংবাদিকতার চার যুগ ধারাবাহিক লেখায় পাঠকদের উদ্দেশ্যে আজ তুলে ধরবো সামাজিক অবক্ষয়ের বলি প্রতিবাদী এক মিজানের কথা। স্মৃতির পাতায় ঘটনার সময়কাল ২০১০ সালের অক্টোবর মাস। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে বখাটেদের ইভটিজিংয়ের শিকার নাটোরের বাগাতিপাড়ার লোকমানপুর কলেজের ছাত্রীকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় কলেজ শিক্ষক মিজান বখাটেদের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েও বাঁচতে পারেননি। এগারো দিনেরও অধিক সময় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে তিনি গত ২৩ অক্টোবর -২০১০, রাতে মৃত্যুর শীতল কোলে ঢলে পড়েন। প্রতিবাদী কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান ছিলেন ৩৬ বছর বয়সের টগবগে রক্তের অধিকারি এক আত্মপ্রত্যয়ী যুবক। তিনি ছিলেন নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক। উক্ত কলেজের একাদশ শ্রেণির কয়েকজন ছাত্রীকে এলাকার বেগুনিয়া গ্রামের দুই বখাটে যুবক আসিফ আলী ও রমজান দীর্ঘদিন ধরে উত্যক্ত করতো এবং অশালীন আচরণ করতো। ছাত্রীরা বিষয়টি তাদের শিক্ষক মিজানুর রহমানকে জানান। মিজানুর রহমান ঘটনাটি কলেজের অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটিকে জানান। এ ছাড়া তিনি অভিযুক্ত ঐ দু যুবককে সতর্ক করে দেন। এ নিয়ে কলেজে সভা ও বসে। এতে ঐ যুবকেরা ্িক্ষপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার দিন ১২ অক্টোবর প্রভাষক মিজান তাঁর মোটর সাইকেল যোগে নিজ বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ডাকরা এলাকার চরলক্ষীপুর গ্রামে যাবার পথে লোকমানপুর কৃঞ্চা কৃষি খামারের নিকট মোটর সাইকেল থামিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। এমন সময় বখাটে আসিফ ও রাজন একটি মোটর সাইকেল নিয়ে দ্রæত গতিতে তার গায়ের উপর উঠে পড়ে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে বখাটেরা লোহার রড দিয়ে তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করে। তাঁর আর্তচিৎকারে আশেপাশের লোকজন ছুটে এলে তারা মোটর সাইকেলটি ফেলে পলায়ন করে। মারাত্মক আহত মিজানকে প্রথমে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা তাঁকে প্রায় ১১ দিন লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু গত ২৩ অক্টোবর রাতে তিনি ইহ জগতের মায়া ত্যাগ করে অভিমান করে চলে যান। পরে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলে হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন। এদিকে মিজান হত্যার আসামি আসিফ আলীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে কিন্তু অপরজন রাজন যে ছিল কলেজ ছাত্র দোহা হত্যারও আসামী, তাকে পুলিশ এখনো গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়নি।
ইভটিজিংএর প্রতিবাদ করায় জীবনদানকারী মিজানের অকাল মৃত্যু যেমন তার পরিবারকে ক্ষতবিক্ষত করেছে তেমনি সারা দেশের সচেতন মানুষের মনে দারুণ রেখাপাত ঘটিয়েছে।
গত মে মাসের শেষ দিকে লালমনিরহাট সরকারি কলেজ ছাত্র কর্তৃক শিক্ষিকাকে ইভটিজিং করার প্রতিবাদ করায় উক্ত কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক জাকির হোসেনকে একইভাবে তাঁরই কলেজের কয়েকজন ছাত্র প্রকাশ্যে কলেজ ক্যাম্পাসে বেধড়ক মারপিট ও লাঞ্চিত করে। বখাটেদের জ্বালাতন থেকে বোনকে রক্ষা করতে গিয়ে সিলেট নগরীর মাসুম মিয়া নামে এক ব্যক্তির উপর বখাটেরা হামলা চালিয়ে তাকে আহত করে। বখাটেপনার প্রতিবাদ করায় মাগুরা প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষন ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সামনে সন্ত্রাসীরা ফরিদপুরের মধুখালি উপজেলার ভূষণা লক্ষীদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোহাম্মদ শরিফুজ্জামানকে(২৮) পিটিয়ে ও গায়ে গরম ডাল ঢেলে গুরুতর আহত করে। তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে অন্য দুজন শিক্ষককেও তারা পিটিয়ে আহত করে। রাজশাহীর তানোরে ইভটিজিংএর শিকার এক স্কুল ছাত্রীর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ ঘটনায় ওই স্কুল ছাত্রী বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। ইভটিজিংএর এমন ঘটনা অহররহ ঘটেই চলেছে। কিন্তু কলেজ শিক্ষক মিজানের প্রতিবাদ এবং বখাটেদের হাতে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সমাজ জীবনে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘটনায় মিজানের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তাঁর প্রতিনিধি পাঠান। গত ২৫ অক্টোবর দুপুরে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সীতারা বেগম প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত প্রভাষক মিজানের পরিবারের সদস্যদের সান্তনা দেন এবং পরিবারের সমস্যার কথা জানতে চান। মিজানের স্ত্রী শোকাভিভূত রাজিয়া সুলতানা মিলি এসময় একটি চাকরির ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার (রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ) কাগজপত্র তিনি সীতারা বেগমকে প্রদান করেন। অপর দিকে ডাচ-বাংলা ব্যাংক সুলতানা রাজিয়ার হাতে ১০ লাখ টাকার একটি সহায়তা চেক তুলে দিয়েছেন। এতে হয়তো তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনমতে বেঁেচ থাকার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু তিনি তাঁর স্বামীকে আর কোনদিনই ফিরে পাবেননা। মিজানের চার বছর বয়সের একমাত্র মেয়ে লুসাইয়া রশিদ মমও আর কোন দিন ফিরে পাবেনা তার বাবাকে। যে বাবা তাকে ঈদ করতে তার নানীর বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রভাষক মিজান যেভাবে জীবন উৎসর্গ করে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেলেন এই ঘটনার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে এটাই সকলের কামনা হওয়া উচিত। আর এর জন্য চাই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তাই গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রচারনা, শিক্ষক, অভিভাবক মহলসহ সচেতন যুব সমাজকে এ ব্যাপারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সংশি¬ষ্ট সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও (এনজিও) এগিয়ে আসতে হবে।(ক্রমশঃ)। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ২৯/০৯/২০২৬.