।। এবিএম ফজলুর রহমান।।
পাবনার সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তার ইতিহাসের সঙ্গে যে কয়েকজন মানুষের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁদের অন্যতম রণেশ মৈত্র। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না ছিলেন একটি সময়ের সাক্ষী, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও বিপ্লবীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। তাই তাঁকে ‘পাবনার সাংবাদিকদের বাতিঘর’ বলা নিছক কোনো উপমা নয়; তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও আদর্শের মধ্যেই এর যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়। আজ তার চতুর্থ প্রয়াণ দিবস। এ উপলক্ষে তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান পাবনা প্রেসক্লাব সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এক স্মরণ সভার আয়োজন করেছে।
রণেশ মৈত্র ১৯৩৩ সালের ৪ অক্টোবর রাজশাহীর নওহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়ায়। বাবা রমেশ চন্দ্র ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাবনা জিসিআই স্কুল থেকে ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবনার বিকাশ ঘটে। রণেশ মৈত্রের সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা ১৯৫১ সালে। সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নও-বেলাল পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এরপর কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সত্যযুগ-এ কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে যোগ দেন দৈনিক সংবাদ-এ। পরে ডেইলি মর্নিং নিউজ, দৈনিক অবজারভার, দ্য নিউ নেশন এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করেন। দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন পাবনার নিজস্ব সংবাদদাতা। এ ছাড়া দি নিউ নেশনের মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেখেছেন ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ সময়, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসনের নানা অধ্যায়, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তন। ফলে তাঁর সাংবাদিকতা ছিল কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সময় ও সমাজকে বুঝে তার অন্তর্নিহিত সত্য তুলে ধরাই ছিল তাঁর সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রণেশ মৈত্র বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সত্য। ২০১৮ সালে একুশে পদক পাওয়ার পর পাবনায় দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি সাংবাদিকদের দলীয় পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সার কথা ছিল সাংবাদিক সত্য বলার সাহস হারালে মানুষ অন্ধকারে থাকবে।
এই বিশ্বাসই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তিনি নিজেও ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে সত্য অনুসন্ধানের পথে বাধা হতে দেননি—এমন কথাই তিনি নিজে প্রকাশ্যে বলেছেন।
পাবনার সাংবাদিকতার বিকাশে রণেশ মৈত্রের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬১ সালে পাবনায় সাংবাদিকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকদের পেশাগত স্বীকৃতি আদায়ে গঠন করেন পুর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি। স্বাধীনতা পরবর্তিতে এটি বাংলাদেশ সাংবাদিক নামে পরিচিতি পায়। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সময়ের সাংবাদিকতা ছিল আজকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর নয়; সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই সংবাদ সংগ্রহ, লেখা এবং তা জাতীয় সংবাদপত্রে পৌঁছে দেওয়া ছিল কঠিন এক কাজ।
তবু তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পাবনার বহু সাংবাদিককে পথ দেখিয়েছে। ২০১২ সালে তাঁর ছয় দশকের সাংবাদিকতা পূর্তি উপলক্ষে পাবনায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল যা তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকজীবনের প্রতি সহকর্মী ও সমাজের স্বীকৃতির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
রণেশ মৈত্রের জীবন সাংবাদিকতার বাইরেও বিস্তৃত। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সংগঠকদের একজন ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৬ সালে ভুট্রা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জীবন তাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক ও অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত।
পাবনায় সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ‘শিখা সংঘ’ প্রতিষ্ঠা এবং এর মাধ্যমে পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কথা তাঁর জীবনকথায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ সংবাদপত্রের পাতার বাইরেও তিনি সমাজকে আলোকিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
রণেশ মৈত্র ছিলেন একজন শক্তিমান লেখক ও কলামিস্টও। তাঁর আত্মজীবনীসহ বিভিন্ন গ্রন্থে উঠে এসেছে তাঁর সময়, সমাজ, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা। নিঃসঙ্গ পথিক, রুদ্র চৈতন্যে বিপন্ন বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে।
তাঁর লেখায় ইতিহাস শুধু তথ্য হয়ে থাকেনি; সেখানে একজন প্রত্যক্ষদর্শী মানুষের অনুভব, সংগ্রাম ও সময়কে বোঝার চেষ্টা ফুটে উঠেছে। এ কারণেই তাঁর লেখালেখি সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও ঐতিহাসিক দলিলের মূল্যও বহন করে। ২০১৮ সালে সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে সম্মানিত করে।
২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের মৃত্যু তাঁর কাজের সমাপ্তি নয়। তাঁর লেখা, তাঁর সাংবাদিকতার আদর্শ, তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি এবং তাঁকে দেখে বেড়ে ওঠা সাংবাদিকদের কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকেন।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা ও সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব।

এবিএম ফজলুর রহমান
স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা
ও
সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব।
মোবাইল নং ০১৭৩২-১১৭০১১
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং।
