হযরত বেল্লাল, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স ও জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস কাটাকাটির ঘটনায় দুই গ্রামের অন্তত ৩৭ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া শিয়ালের কামড়ে ৯ জন মানুষ ও দুটি গরু জলাতঙ্কের ঝুঁকিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। হঠাৎ করে দুটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় আক্রান্ত গ্রামসহ গোটা উপজেলায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা, উঠান বৈঠক এবং মানুষ ও পশুকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রোগ নিশ্চিতকরণ ও গবেষণার জন্য শিয়ালের মাথা এবং অসুস্থ গরুর মাংসের নমুনা সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক পরীক্ষায় গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্স এবং শিয়ালের নমুনায় জলাতঙ্কের জীবাণু পাওয়া গেছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের দুলাল গ্রামের হাবিবুর রহমানের একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় গরুটি জবাই করে এর মাংস মানুষের মধ্যে বিক্রি করা হয়। একইভাবে গত ১৮ সেপ্টেম্বর সর্বানন্দ ইউনিয়নের বাছহাটী গ্রামের মঞ্জুরুল ইসলামের একটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটিও জবাই করা হয়। দুই ঘটনায় অন্তত দুই শতাধিক মানুষ ওই মাংসের সংস্পর্শে আসেন বা মাংস কাটাকাটির সঙ্গে জড়িত হন।
এর এক থেকে দুই দিন পর কয়েকজনের শরীরে ফোসকাসহ অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে রোগটি শনাক্ত হয়। বর্তমানে দুই গ্রামের আক্রান্ত ব্যক্তিরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের জিগাবাড়ি ও তালুক বেলকা গ্রামে শিয়ালের কামড়ে শিশু ও নারীসহ ৯ জন আক্রান্ত হন। একই ঘটনায় দুটি গরুও আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তরা তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে একজন বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।
অ্যানথ্রাক্স ও জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাবের খবর পেয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের ডেপুটি চিফ এপিডেমিওলজিস্ট ডা. মো. রফিকুল ইসলাম, ইউএলও ডা. সাজেদুল হায়াত, ডা. মোছা. কামরুন্নাহার আক্তারসহ একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এর পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর আইইডিসিআরের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল রহমান, ডা. কাজী তাহমিনা করিম, এফইটিসি ফেলো ডা. মোস্তফা মাহমুদ, ডা. মেরি হাপাং ও মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট ড. দৌলত খানসহ একটি প্রতিনিধি দল আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার গরু রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো এলাকায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হলে ওই এলাকার আশপাশের তিন কিলোমিটারের মধ্যে থাকা গরুকে টিকা দেওয়ার কথা। সে অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৪৫ হাজার গরুকে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হলেও বুধবার পর্যন্ত ৩০ হাজার টিকা পাওয়া গেছে। জনবল সংকটের কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
খামারি ও গরুর মালিকরা বলছেন, টিকা ও জনবল সংকটের কারণে সময়মতো টিকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, ২০২৫ সালেও সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগাম টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্তদের বক্তব্য নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ পাওয়া গেলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আক্রান্ত এলাকার গরু-ছাগলকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং গরুর মালিকদের সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর রক্ত বা আক্রান্ত টিস্যুর সংস্পর্শে এলে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে মাংস ভালোভাবে রান্না করা হলে ঝুঁকি কমে যায়। শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত পশুকেও টিকা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষাগারে প্রাথমিকভাবে গরুর মাংসে অ্যানথ্রাক্স এবং শিয়ালের নমুনায় জলাতঙ্কের জীবাণু পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চলছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, খবর পাওয়ার পর মেডিকেল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্তদের হাসপাতালে আসার পরামর্শ দেয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে দুই গ্রামের ৩৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত ৯ জনের মধ্যে একজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং অন্যরা চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, আক্রান্তদের গুরুত্বসহকারে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিয়ালের কামড়ে আক্রান্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবর মাসেও সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ওই সময় ২৫ জন আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে ১০টি গরু ও এক নারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
