ফেলে আসা দিনগুলো- ৭৩

এবাদত আলী

চট্রগ্রামে হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) মাজারে ভ্রমণকালে তাঁর মাতৃভক্তির যে ঘটনা জানা যায় তা হলো তখনকার এক রাতে হজরত বায়েজিদের মাতার অসুস্থ অবস্থায় পানির পিপাসা হলে তিনি স্বীয় পুত্রকে পানি পিপাসার কথা ব্যক্ত করলে হজরত বায়েজিদ মাতাকে পানি পান করানোর জন্য কলসির নিকটে গেলে তা শূন্য দেখতে পেয়ে সুরাহির দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখেন তাতেও কোন পানি নেই। অগত্যা তিনি বাধ্য হয়ে কুঁজো বা পাত্র নিয়ে দুরের এক ঝরনা থেকে পানি নিয়ে ফিরে এস দেখেন তাঁর মাতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মা ঘুম থেকে উঠে পানি চাইলে যেন তাৎক্ষণিক দেওয়া যায় সেজন্য তিনি পানির গ্লাস হাতে নিয়ে সারা রাত মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। ভোরে ঘুম থেকে জেগে বায়েজিদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা সব ঘটনা বুঝতে পারেন। ছেলের এমন গভীর ভালোবাসা ও আত্মত্যাগে আপ্লুত হয়ে মা তাঁর জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে সর্ব্বোচ্য আধ্যাত্মিক মর্যাদার দোওয়া করেন, যা কবুল হয়েছিলো।
তাপসপ্রবর হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) সম্পর্কে জানা যায় একদিন তিনি তাঁর দরবারে ভক্তবৃন্দকে নিয়ে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, এমন সময় সেখানে এক বিখ্যত তাপস এসে হাজির হলেন। তিনি সকলের ধ্যানমগ্ন অবস্থা দেখে এক কোনে তিনিও ধ্যনে মগ্ন হলেন। অনেক সময় পর তাপস মোরাকাবা সমাপ্ত করে চোখ খুল্লেন। কিছুক্ষণ বাদে হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) মোরাকাবা শেষ করে দেখলেন এক আগন্তুক অপেক্ষা করছেন। উক্ত আগন্তক হজরতকে জিঞ্জাসা করলেন হুজুর আপনি এতক্ষণ কোথায় অবস্থান করছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, মা’বুদের সকাশে ছিলাম। তাপস বল্লেন, আমিও তো তাঁরই দরবারে ছিলাম কিন্তু কই আপনাকে তো সেখানে দেখতে পেলামনা। হজরত বায়েজিদ বোস্তামী(রহ.) বল্লেন আপসি ঠিকই বলেছেন, আমাকে আপনি দেখবেন কি করে আপনি তো পর্দার বাইরে ছিলেন আর আমি ছিলাম ভিতরে। তাপস লজ্জিত হয়ে বল্লেন হুজুর আমি আপনার সম্পকের্ যে উচ্চ আশা পোষণ করেছিলাম আপনি তারও উপরে। সে সময় একবার রোমক সেনাদেও সাথে আরব মুসলিম সৈন্যদের ভয়ংকর যুদ্ধ চলছিলো। যুদ্ধে অগণিত দুর্ধর্ষ রোমকদের কাছে নগন্যসংখ্যক মুসলিম সেনাদের পরাজয় আসন্ন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়। এসময় হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) রোমেই অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তিনি এক অদৃশ্য ভীতিকর আওয়াজ শুনতে পেলেন,বয়েজিদ সাহায্য কর। আওয়াজ শোনামাত্রই তিনি হাতে এক মুষ্ঠি মাটি নিয়ে ছুঁড়ে মারলেন। ঠিক সেই সময় রোমে যুদ্ধরত মুসলমান সৈন্যগণ দেখতে পেলেন যে, খোরাসানের দিক হতে এক প্রচন্ড আগুনের গোলা লেলিহান শিখা বিস্তার করে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে উড়ে আসছে। ক্ষণেকের মধ্যেই তা রণাঙ্গনের গ্রিক সৈন্যদের পানে ধাবিত হলো। গ্রিক সৈন্যগণ আতঙ্কে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেল। একদা হজরত আবু মুসা নামক এক বুজর্গ ব্যক্তি হজরত বায়েজিদ বোস্তমী (রহ.) এর নিকট আরজ করলেন এই বলে যে, আল্লাহর রাস্তায় চলার মূল সম্বলটি কি? উত্তরে হগজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) বল্লেন, আমি তো অনেক কিছুই দেখলাম কিন্তু তেমন বস্তু কিছুই পেলামনা। নিজের নফ্সকে বাধ্য করার জন্য জন্য বহু চেষ্টা করেছি। আল্লাহর পথে পরিচালনার জন্য শাস্তিও কম দেই নি, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। ক্ষণিকের জন্য বশে থাকলেও তা আবার অবাধ্য হয়েছে। কিন্তু যখন আমার প্রতি আল্লাহর রহমতের বারি বর্ষিত হলো তখন তা (নফ্স) আপনা হতেই আমার বশ্যতা স্বীকার করলো এবং আল্লাহর পথে ধাবিত করলো। অতএব বলতে হয় নেক সফলতা কেবল আল্লাহর তরফ থেকেই লাভ করা যায়। এমনি বহুবিধ কাহিনী তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়।
ইরানের বিখ্যাত ওলি, ওলিকুল শিরমনি, সুলতানুল আউলিয়া হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমণের সঠিক কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়না। ধারণা করা হয় সুফি সাধক ও আ্উলিয়াগণ চট্রগ্রামে ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় সচরাচার পাহাড়ের উপরে কিংবা জঙ্গলঘেরা অঞ্চলে আবাস স্থাপন করেন এবং এসব জায়গাতে খানকা কিংবা এই ধরণের স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের ওফাতের পর যা পরবর্তীকালে ভক্তগণ মাজার হিসেবে স্থাপনা গড়ে তোলেন। হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) মাজারটিও মূলত উনাকে উৎসর্গ করে প্রতিষ্ঠত একটি প্রতিরূপ মাত্র।
যদিও এলাকার জনশ্রুতি অনুযায়ী হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) চট্রগ্রামে আগমণের ইতিহাস শুনতে পাওয়া যায়। চট্রগ্রামে অবস্থানের পর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের কালে ভকক্তকুল তাঁকে থেকে যাবার অনুরোধ করলে তিনি তাদেও ভালোবাসা ও ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে নিজের কনিষ্ঠ আঙ্গুল কেটে কয়েক ফোটা রক্ত মাটিতে পড়ে যেতে দেন এবং উনার নামে মাজার গড়ে তোলার কথা বলে যান। এই জনশ্রুতির স্বপক্ষে অষ্টাদশ শতাব্দীর চট্রগ্রামের কিছু কবির কবিতার উল্লেখ করা হয় যেখানে শাহ সুলতান নামক একজন মনীষির নাম বর্ণিত আছে। হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) কে যেহেতু সুলতানুল আরেফিন হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় সেই সুত্রে এই শাহ সুলতান আর সুলতানুল আরেফিনকে একই ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এই সমাধির অবয়ব সর্বপ্রথম ১৮৩১ সালে পাহাড়ের উপরিভাগে একটি দেয়ালঘেরা আঙ্গিনার মাঝে আবিষ্কার করা হয়। আঙ্গিনার ঠিক মাঝামাঝি একটি শবাধার অবস্থিত। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৫০ থেকে আশি ফুট উপরে এই শবাধারটি অবস্থিত। পরবর্তীকালে সমাধিস্থলটি আধুনিক কাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং মাজার হিসেবে রূপলাভ করে। এই মাজরের নিচের ভাগে সমতল ভূমিতে পাহাড়ের পাদদেশে একটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মুঘল রীতির আয়তাকার একটি মসজিদ রয়েছে। স্থাপত্যশৈলী থেকে ধারণা করা হয়যে মোঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে মসজিদটি নির্মিত। আমরা মাজার শরীফ জিয়ারতের জন্য পবিত্র ফাতেহা শরীফ পাঠান্তে মোনাজাত শেষ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। এবার ফিরবার পালা। প্রধান ফটক পেরিয়ে একটি স্কুটার যোগে লালখান বাজারের বাঘঘোনায় ভাগ্নে আব্দুর রহিমের বাসায় ফিরে এলাম। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট )।

এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব। তারিখ: ২০ / ০৭ /২০২৬.