এবাদত আলী
চট্রগ্রামে অবস্থানকালে আমাদের ভ্রমণসূচীতে সর্বপ্রথম সুলতানুল আওলিয়া হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) এ মাজার শরীফের নাম উঠে এলো। পরদিন সকাল বেলা তাই তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। লালখাঁনবাজার থেকে একটি বেবিট্যাক্সিতে করে নাসিরাবাদ মাজার এলাকায় গিয়ে পৌঁছলাম
চট্টগ্রামের লোকেরা এই এলাকার নাম রেখেছে ব’াজে বোস্তান। বেবিট্যাক্সি থেকে নেমেই চোখে পড়লো বিরাট একটি তোরণ। এই তোরণ দিয়ে মাজারের দিকে যেতেই রাস্তার দুপাশে বসা দোকানিরা হাঁকডাক শুরু করে দিলো। তাদের আবদার মোমবাতি, গোলাপজল, আগরবাতি আর কচ্ছপের খাবার যেন তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যাই। কিছু দুর যেতেই বামপাশে বিশাল একটি দিঘী। দিঘীর বাঁধানো সানের পাড়ে পানির কিনারে অসংখ্য কচ্ছপ। খাবার দিলে হাতের নাগালের মধ্যেই এদের পাওয়া যায়। সান বাঁধানো ঘাটে পানিতে নামলে কচ্ছপেরা দু’পা জড়িয়ে ধরে। দর্শনার্থীদের মাঝে যারা কাঠির মাথায়ভরা খাবার, কলা, বিস্কুট সঙ্গে নিয়ে যায় তারা নিজ হাতে কচ্ছপদেরকে খাবার খাওয়ায়। আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কেউ কেউ আবার কচ্ছপের পিঠ ধোয়া পানি পান করে থাকে। জনশ্রুতি আছে হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) এই কচ্ছপের বংশধরদেরকে একসময় খুব আদর করতেন। আর তখন থেকেই এই পুকুরে সেইসকল কচ্ছপের বংশধরেরা আজো রয়েছে।
হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) কত যুগ আগে এবং কিভাবে এই এই পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রামে আগমণ করেছিলেন তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। তাছাড়া চট্টগ্রামের এই বোস্তান শহরেই যে হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) এর মাজার অবস্থিত তারও কোন ঐতিহাসিক সত্যতা মেলেনা। এখানকার বায়েজিদ বোস্তামী (র.) আর মধ্য এশিয়ার আরব দেশের অন্তর্গত বোস্তাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী (র.) একই বুজর্গ ব্যক্তি কিনা তা নিয়েও যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। ড. মোহাম্মদ এনামূল হক রচিত “পুর্ব পাকিস্তানে ইসলাম” গ্রন্থে উল্লেখ আছে চট্টগ্রাম বন্দরে যখন থেকে আরব বণিকেরা উপনিবেশ স্থাপন করেন তখন থেকেই ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হতে থাকে। নবম শতাব্দীতে বিখ্যাত দরবেশ সুলতান বায়েজিদ বোস্তামী (র.) ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থে চট্টগ্রামে আগমণ করেন। ২৬১ হিজরিতে (৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ) পারস্যের বিস্তাম নগরে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সমাহিত হন। চট্টগ্রাম শহরের ৫ মাইল উত্তরে নাসিরাবাদ গ্রামে (বর্তমানে বোস্তাম শহরে) এক পর্বত চুড়ায় এই সাধকের একটি স্মারক সমাধি তাঁর চট্টগ্রাম আগমণের স্মৃতি বহন করছে।”এই মাজার শরীফে খেদমতরত খাদেমের মধ্যে খাদেম খায়রুল বাসার ও মৌলভী হাবিবর রহমানের সঙ্গে আলাপ করে এধরণের মতবিরোধের কথা পাড়তেই তাঁরা একবাক্যে ঐ ধরণের কথা আজগুবি ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন।
বিখ্যাত কামেল ওলি হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.) এর জীবনী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও সুত্র হতে জানা যায় যে, তিনি আরব দেশের বোস্তাম নগরীতে ১৬০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম ছিলো তাইফুর। বায়েজিদ হজরতের পোশাকি নাম। শোনা যায় তাঁর পিতামহ ছিলেন একজন অগ্নিপুজক। বোস্তামে তিনি অতি গন্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন। হজরত বয়েজিদ (র.) এর পিতা সমসাময়িক যুগের জনৈক মুসলিম দরবেশের নিকট থেকে পবিত্র ইসলাম ধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। অতঃপর এলমে শরিয়ত ও এলমে মারেফাত উভয় দিকেই যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেন। তাই তিনি নিজের শিশু পুত্র বায়েজিদকে নিজে ধর্মীয় শিক্ষা দিতে থাকেন এবং আরো কয়েকজন শিক্ষককে দিয়ে পুত্রের শিক্ষা দীক্ষার পথ সুগম করেন। তাঁকে মাদ্রসায় ভর্তি করার কিছুকাল পরেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। হজরত বায়েজিদের মাতাও পূণ্যবতী মহিলা রুপে বোস্তাম ব্যাপি খ্যাতি ছিলো। স্বামীর সহসা মৃত্যু ঘটলে তিনি তাতে বিচলিত না হয়ে পুত্রের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ যতœবান হলেন। হজরত বায়েজিদ তীক্ষè মেধার ছাত্র ছিলেন। একদিন তাঁর এক ওস্তাদ পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের ব্যাখ্যাসহ অনুবাদ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। ঐ সময় যখন তিনি ওস্তাদের মুখে শুনলেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ফরমান ‘‘অর্থাৎ আমার নিকট এবং স্বীয় মাতা-পিতার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর”। তখন তিনি ওস্তাদের নিকট হতে মায়ের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁর মাতা অসময়ে তার আগমণের কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন যে আজ মাদ্রসায় কোরআন পাকে এক আয়াত পাঠ করেছি। তাতে আল্লাহ পাক তার বান্দাকে নিজের প্রতি এবং পিতা-মাতার প্রতি শোকর গুজার করতে আদেশ দিয়েছেন। আমিতো ভেবে পাইনা এই দুই কাজ একসঙ্গে আমি কিভাবে সমাধা করবো। হয় মাবুদের নিকট হতে আপনি আমাকে চেয়ে নিন তাহলে আমি কায়মনবাক্যে আপনার খেদমতে নিযুক্ত হই। নতুবা আমার প্রতি আপনার দাবি প্রত্যখ্যান করুন যাতে আমি মনেপ্রাণে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে থাকতে পারি। পুত্রের এহেন কথা শুনে বিদুষী জননী বল্লেন আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে প্রিয় মাবুদের হস্তে তোমাকে সমর্পণ করলাম। তুমি নিশ্চিন্ত মনে স্বীয় দেহ মন তাঁর সেবায় উৎসর্গ করে দাও।
তখনকার এক রাতে হজরত বায়েজিদের মাতার পানি পিপাসা হলে তিনি স্বীয় পুত্রকে পানি পিপাসার কথা ব্যক্ত করলে হজরত বায়েজিদ মাতাকে পানি পান করানোর জন্য কলসির নিকটে গেলে তা শূন্য দেখতে পেয়ে সুরাহির দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখেন তাতেও কোন পানি নেই। অগত্যা তিনি পানির জন্য নদীর পাড়ে গেলেন এবং পানি নিয়ে ফিরে এস দেখেন তাঁর মাতা ঘুমিয়ে পড়েছেন। (ক্রমশঃ) (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট )।
এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব।
তারিখ: ১৭ / ০৬ /২০২৬.
