যমুনা নদীর পাড়ে ভ্রমণ পিপাসুদের মিলন মেলা

ওসমান গনি বেড়া (পাবনা)
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যমুনার বিস্তীর্ণ নদীর পাড় ও খোলা জায়গাগুলো যেন ভ্রমণ প্রেমীদের কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।ছুটিতে এসব স্থানে পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া মানুষের অন্যতম একটি নেশা।
ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জেলাগুলোর মধ্যে, পাবনার বেড়া উপজেলা খুবই বিখ্যাত। তাই ছুটির দিন কিংবা ঈদ উৎসবে নারী-পুরুষসহ ছোটবড় সবাই ছুটে আসেন উপজেলার হাটুরিয়া – নাকালিয়া ইউনিয়নের পেচাকোলা যমুনা নদীর ঘাট ও কৈটোলা ইউনিয়নের আওয়াল বাঁধ যমুনা নদীর পশ্চিম পাড় তীর সংরক্ষণ প্রকল্প এলাকায়।সুযোগ পেলেই, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণ পিপাসুরা ছুটে আসেন এখানে।ঈদ ছাড়াও বিভিন্ন ছুটির দিনে এখানে ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী সবাই অবসর সময় কাটাতে আসেন। বিভিন্ন উৎসব কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিকেল হলেই যমুনার পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ। প্রচুর মানুষ আসায় নদীর পাড়ে অনেক ছোট-বড় ফাস্টফুড খাবার এবং ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। এখানে বেড়াতে আসা অনেককেই ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্টের সামনে বেঞ্চে বসেই যমুনা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন। আবার অনেকেই নৌকা কিংবা ট্রলার ভাড়া করে ঘুরে বেড়ান বিশাল যমুনার বুকে এবং চরাঞ্চলে।দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ায় নদী পাড়ে ছোটখাটো ব্যবসার প্রসার ঘটছে যা ওই স্থানের অর্থনীতির চাকাকে সচল করছে।উপজেলা ছাড়াও জেলা শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপজেলার দূর-দূরান্ত থেকে পড়ন্ত বিকেলে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-স্বজনসহ বিভিন্ন বয়সের হাজারো মানুষের সমাগমে মুখরিত হয় যমুনার পাড়। নদী পাড়ের বিশুদ্ধ বাতাস আর প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য উপভোগ করে ভ্রমণ পিপাসু মানুষগুলো। সোমবার উপজেলার হাটুরিয়া – নাকালিয়া ইউনিয়নের পেচাকোলা ও আওয়াল বাঁধ ঘাটে ওই যমুনার পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ-যুবকসহ নানা বয়সী হাজারো মানুষে মুখরিত যমুনার ডান তীর রক্ষা প্রকল্প এলাকা । সদ্য বিদায়ী ঈদুল ফিতর এবং ছুটির দিন হওয়ায় এখানে কিছুটা বেশিই ছিল আনন্দ প্রেমি মানুষের উপস্থিতি। এছাড়া ঈদ পরবর্তী বৈরি আবহাওয়ার কারণে বাড়িতে আটকে পড়া আনন্দ বিলাসী মানুষগুলোও ঈদের ছুটিতে অনুকূল আবহাওয়ায় ঘুরতে এসেছেন এখানে। নিরব প্রকৃতির বিশুদ্ধ নির্মল বাতাসে ভ্রমণ পিপাসুরা মেলে ধরেছেন নিজেদেরকে। যেন স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছেন তারা। নানা ঢঙে ছবি তুলছেন কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীরা। কেউ কেউ সেলফিতে বন্দি করছেন নিজেদের। কেউবা পরিবার নিয়েও ছবি তুলছেন। কেউ কেউ প্রকৃতির সেই মনোহর দৃশ্যের ভিডিও ধারণে ব্যস্ত।শিশুরা মনের আনন্দে খেলছে। শিশুদের আনন্দে আনন্দিত হচ্ছেন বাবা-মা। ফুচকা, চটপটি, হালিম,আচার, বাদাম ঝালমুড়ি ও পাপড়সহ প্রায় ৪০ ধরণের নানা মসলা দিয়ে পানের দোকান এবং নানা মুখরোচক খাবারের দোকানে প্রাণবন্ত হয়েছে এলাকাটি । যা স্থানটির পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছে। পেচাকোলা ঘাটের দক্ষিণ অংশের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দুরে গিয়ে দেখা যায় আওয়াল বাঁধ ঘাট। এবং উত্তরে প্রায় দুই কিলোমিটার অংশে মোহনগঞ্জ থেকে শুরু করে মোট সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার যমুনা নদীর ডানতীর রক্ষা প্রকল্প এলাকা জুড়ে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এক অনন্য সৌন্দর্য স্মৃতি রয়েছে।নদী পাড়ের শেষ মাথায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (সিসি ব্লক ) যেন বসার বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছেন ভ্রমণে আসা দর্শনার্থীরা, সেখান থেকে দেখা যায় নদীতে বেশ স্রোত বহমান। দূর চরে দেখা যায় সবুজে ঘেরা গ্রাম, দিনের আলো বিলানো শেষে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ডুবু ডুবু তখনও এখানে দলে দলে আসছিল বিনোদন প্রেমি মানুষেরা।
ঢাকায় বাবা-মার সাথে বসবাসরত হরিরামপুরে ঈদ করতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী অদিতি বলেন, এমন খোলামেলা স্থান যে কারোরই মন কাড়বে। আমরা যাঁরা ইট-পাথরের দালানে বন্দি তারা প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাস, নদী-মাটি, নৌকা, সবুজে ঘেরা বাগান ছোঁয়ার সৌভাগ্য হয়না বললেই চলে। আমরা ঢাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশ পাইনা , যা পাই , তা কৃত্রিম লেক। এখানকার প্রকৃতির নির্মল বিশুদ্ধ বাতাস, বিস্তৃত নদী, নদীর পানি, সবুজ প্রকৃতি, নির্মল বাতাস নদীতে নৌকা চলার মতো নানা মনোহর দৃশ্যে আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানকার জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত এটিকে পরিপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করতে উদ্যোগী হওয়া।
কথা হয় পাবনা ইউরো মেডিকেল সেন্টারের ডা.আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথে, তিনি বলেন, আমি এই এলাকার স্থানীয় সন্তান চিকিৎসা সেবার জন্য শহরে থাকতে হয়। তবে সুযোগ পেলেই এখানে ছুটে আসি, যমুনা নদীর ঘাটে নির্মল বাতাস এবং খোলামেলা পরিবেশে যেন শৈশবের দিনগুলো ফিরে পাই।
এখানকার প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আন্তরিক হলেই এই স্থানটি এ উপজেলার মানুষের জন্য আরও পরিপূর্ণ একটি বিনোদন কেন্দ্র হতে পারে । ভ্রমণে আসা মানুষের নিরাপত্তার জন্য এখানে রাতে লাইট খুব জরুরী। এছাড়া আধুনিক বসার ব্যবস্থা, বাঁধে ব্লক স্থাপন, বৃক্ষ রোপনের মতো সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবিও জানান এই চিকিৎসক।
ঝালমুড়ি ও লেবুর শরবত দোকানি বিলাল হোসেন বলেন, বিকেল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ৪- ৫ হাজার টাকা বিক্রি হয়। হালিম, চটপটি ও ফুসকা বিক্রতা রাসেল মোল্লা জানান, ঈদের দিন সে ২১ হাজার টাকা বিক্রি করেছে, অন্যন্য দিন তিনি ৮-১০ হাজার টাকা বিক্রি করেন। এখানে সব সময়ই কম-বেশি মানুষ ঘুরতে আসেন। তবে, দুই ঈদে এখানে প্রচুর মানুষের ভিড় হয় এছাড়া শুক্রবারেও মোটামুটি মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন।দর্শনার্থী বেশি হলে আমাদের হরেক রকম ভ্রাম্যমাণ দোকানদারদের ব্যবসাও ভাল হয় সেদিন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো.আব্দুল হামিদ সরকার বলেন ,
প্রায় বছর দুয়েক আগে দর্শনার্থীদের বসার জন্য পেচাকোলা নদীর ঘাটে তাঁর ইউনিয়ন থেকে রড সিমেন্ট দিয়ে ১৩ টি বেঞ্চ নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। আগামীতে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে আরও কিছু বেঞ্চ
নির্মাণ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন তিনি।