— এবাদত আলী —
সে এক লোমহর্ষক ভীতিপ্রদ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারি কাহিনী। আমাদের এই সভ্য সমাজে মানুষ মানুষের গোশ্ত ও কলিজা ভক্ষণ করে এমন কথা কখনো শোনা যায়না। কিন্তু বাস্তবে সেই মানুষের গোশ্ত ও কলিজা ভক্ষণকারি খলি লুল্লাহকে যখন দেখলাম তখন তার চেহারার মাঝে কেমন যেন এক অস্থির প্রকৃতির ভাবুক ব্যক্তি বলে পরিলক্ষিত হলো।
খলিলুল্লাহ তখন বদ্ধ উন্মাদ। তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালের একটি বিশেষ নিরাপত্বা সেলে রাখা হয়েছে। লোমহর্ষক এই ঘটনার সুত্রপাত ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে। ৩ এপ্রিল তারিখে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত একটি বক্স নিউজ পাঠ করে সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। পত্রিকার ছবিতে দেখা যায় একটি লাশের বুক চিরে কলিজা বের করে খেয়ে চলেছে এক ব্যক্তি। পত্রিকায় খবর প্রকাশ হবার পরপরই তোলপাড় শুরু হয়। তাকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞগণ একটি বোর্ড গঠন করেন। সেখানে খলিলুøাহ সম্পুর্ণ একজন মানসিক রোগি হিসেবে বিবেচিত হয়। অগত্যা তার সুচিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে তাকে পাবনা মানসিক হাপাতালে পাঠনো হয়। বাংলাদেশের মানসিক রোগিদের জন্য একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র পাবনা মেন্টাল হসপিটাল বা পাবনা মানসিক হাসপাতালে একজন কলিজা খেকো রোগি ভর্তি হয়েছে শুনে তাকে দেখার জন্য কৌতুহলি সাধারণ মানুষের ভিড় জমে যায়। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে কর্তপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়। নিয়মিত আনসার সদস্যদের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়।
আমাদের তখন সবেমাত্র সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি । পাবনা সদর মহকুমায় মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক। সাংবাদিক শব্দটাই সাধারণ্যে দারুণ কৌতুহলের বিষয়। তখন সমাজ জীবনে সাংবাদিকদের মর্যাদা ছিলো ঢের বেশি। আমার এক সাংবাদিক বন্ধুকে সাথে নিয়ে আমরাও গিয়ে হাজির হলাম পাবনা মানসিক হাসপাতালে। 
হাসপাতালের প্রধান ফটকে গিয়ে আমরা আটকে গেলাম। নিরাপত্তা কর্মিরা কিছুতেই ভেতরে ঢুকতে দিবেনা। আমরা সাংবাদিক পরিচয় দিতেই দায়িত্বরত একজন ইনটারকম টেলিফেনে কার সঙ্গে যেন অনেকক্ষণ কথা বল্লেন । অবশেষে আমাদের প্রবেশের অনুমতি মিল্লো। সঙ্গে একজন আনসারকে দেওয়া হলো। প্রধান ফটক থেকে মুল হাসপাতাল বেশ দুরে অবস্থিত। সুড়কি বিছানো রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সবুজ ঘাসের সমারোহ। দুের কিছু গাছপালা। প্রায় ১ শ ১১ একর জায়গা নিয়ে এই মানসিক হাসপাতাল। ১৯৫৭ সালে তৎকালিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান এই হাপসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে পাবনা শহরের পুবে শীতলাই হাউসে মাত্র ৬০টি বেড নিয়ে এর কার্যক্রম আরম্ভ করা হয়। পরে ১৯৬৬ সালে হিমায়েতপুরে শ্রী শ্যী ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উপর এই মানসিক হাসপাতাল প্র্রতিষ্ঠিত হয় ।
যাক আমরা পাবনা মানসিক হাসপাতালের মুল ফটকের নিকট পৌঁছালে এক ভদ্রলোক এসে হাসি মুখে বল্লেন আপনারা খলিলুল্লাহকে দেখতে এসেছেন। আমরা হাঁ সুচক উত্তর দিতেই তিনি বল্লেন চলেন পারিচালিক স্যার আপনাদেরকে সালাম দিছেন। তাঁর সঙ্গে আমরা পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করতেই তিনি বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে জানালেন যে ঐ রোগির সঙ্গে দেখা করা বারণ আছে। আপনারা যেহেতু সাংবাদিক তাই অনুমতি দিলাম তবে তার সাথে কোন কথা বলা যাবেনা। শুধু তাকে দেখতে পারবেন। আমরা তার শর্তে রাজি হলাম। তিনি আমাদের দিকে একটি ফাইল এগিয়ে দিয়ে বল্লেন এটা হলো খলিলুল্লাহর কেস হিষ্ট্রি ফাইল । আপনারা ঘুরে আসুন ততক্ষণে আমি ফাইলটা টাইপে দিচ্ছি। তিনি আমাদের সঙ্গে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞকে দিলেন। আমরা তার পিছু পিছু রওনা হলাম। পাবনা মানসিক হাসপাতালে শুধু পাগল আর পাগল। আউট ডোর- ইনডোর সবখানেই পাগলের আমদানি। রোগির আত্মীয় স্বজন, ওয়ার্ডবয়, নার্স ডাক্তারসহ যার সঙ্গে দেখা হয় প্রথমে তাকেই পাগল বলে মনে হয়। আমাদের হাতে ওয়ান টুয়েন্টি বক্স ক্যামেরা দেখে অনেকে হয়তো মনে করে বসে এরাও পাগল। তবে পাগলদেরকে নির্ধারিত সেলের ভিতরে রাখা হয়। বদ্ধ পাগলদের জন্য আলাদ আলাদা সেল রয়েছে। সেলে উঁচু ওয়াল এবং মজবুত গ্রিল করা। খলিলুল্লাহকে রাখা হয়েছে দোতলার একটি নির্জন কক্ষে। সেখানকার পাহারার ব্যবস্থা খুবই উচ্চ মার্গের। তিনজন নিরাপত্তা রক্ষি, একজন ওয়ার্ড বয় ও একজন নার্স এগিয়ে এসে ডাক্তার এবং আমদেরকে সালাম জানালেন। আমরা খলিলুল্লাহকে দেখলাম। দেখলাম মরা মানুষের গোশ্ত ও কলিজা খেকো একজন মানুষকে। মাথা ভর্তি ঘন চুল, মুখে চাপ দাড়ি। তুলনামুলক সে একটু লম্বা। দেখে একজন বদ্ধ পাগল বলেই মনে হলো। তার সঙ্গে কোন কথা বলা যাবেনা বলে ওয়ার্ডবয় জানালেন। তবে আমরা যখন তার ছবি নিলাম তখন সে নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। মানুষ খেকো খলিলুল্লাহকে দেখে আলাদা কোন মানুষ বলে মনে হলোনা। কিন্তু এই ব্যক্তিই মরা মানুষের গোশ্ত ও কলিজা ভক্ষণ করতো তা বিশ^াস করাই কঠিন। ডাক্তার নার্স ও ওয়ার্ডরয় জানালেন সে প্রায় সময়ই চুপ থাকে। কিন্তু রাতের বেলা চিৎকার চেঁচামেচি করে। সে কারো সঙ্গে কোন কথা বলেনা। তবে একা একা বিড় বিড় করে সময় সময় কি যেন বলে।
যাক সেখান থেকে আমরা পরিচালকের কক্ষে গিয়ে খলিলুল্লাহর কেস হিষ্ট্রি নিয়ে ফিরে এলাম। খলিলুল্লাহর কেস হিষ্ট্রি এবং বিভিন্ন তথ্য-সুত্র থেকে জানা যায় যে, ছোট বেলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রবি ডোমের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিলো। তখন সে লালবাগ এলাকায় থাকতো। সেখান থেকে সে প্রতিদিন হেঁটেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতো। হাসপাতাল মর্গে রবি ডোমের বাবা ছিলেন ঢাকা মেডিতেল কলেজ হাসপাতালের প্রথম ডোম। সেইই প্রথমে খলি লুল্লাহ ও রবি ডোমকে মরা মানুষের কলিজা খেতে দেয়। পরে রবি ডোম নরমাংস খাওয় ছেড়ে দেয় কিন্তু খলিলুল্লাহ এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যে সে আর কিছুতেই তা ছাড়তে পারেনা। অন্তত ১৫ দিন পর পর তার নরমাংস চাইই। তখন সে মিডফোর্ড হাসপাতালের গোপাল ডোম ও সোনা ডোমের শরণাপন্ন হয়। তারা ও তাকে মরা মানুষের মাংস ও কলিজহা ভক্ষনের সুযোগ করে দেয়। তার কেস হিষ্টি থেকে আরো জানা যায় নরমাংস ছাড়াও লাশের কাফনের কাপড় চুরি করা তার নেশাতে পরিনত হয়। ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থান থেকে কবর খুঁড়ে কাপড় নিয়ে তা মৌলভীবাজারের কাছাকাছি পুরোনো কাপড়ের দোকানে বিক্রি করে স্বাভাবিক খাবার কিনে খেত।
১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে দৈনিক বাংলায় খবর প্রকাশিত হবার পর খলিলুল্লাহকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালিন তত্বাবধায়ক কর্ণেল এম এল রহমানের কক্ষে হাজির করা হয়। তত্বাবধায়ক ততক্ষনাৎ কলেজের অধ্যক্ষ এম এ জলিল ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাক্তার আব্দুস সামাদসহ আরো কয়েকজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞকে ডাকেন। তারা খলিলুল্লাহকে অভয় দিয়ে ঘটনা খুলে বলতে বল্লে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। খলিলুল্লাহ সকল কথা খুলে বলে। সব কথ্য শুনে তারা রীতিমত হতবাক হয়ে যান। এরপর তাৎক্ষনিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের রান্নাঘর হতে মুরগির কাঁচা মাংস এনে দেওয়া হয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে মুরগির কাঁচা মাংস সকলের সামনেই চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। এরপর হগগাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন তাকে আর জনসমক্ষে রাখা যাবেনা। পরে সে জ্যান্ত মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এ আশঙ্কায় পুলিশ ডাকা হয়। পুলিশ খলিলুল্লাহকে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে কড়া পাহারায় রমনা থানায় নিয়ে যায় এবং নতুন করে জেরা শুরু করে। পুলিশি জেরায় সে মানুষের গোশ্ত ও কলিজা খাবার কথা অকপটে শিকার করে। সে আরো জানায় সে অতীতেও খেয়েছে এখনো মানুষের গোশ্ত ও কলিজা খাবে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়। সবকিছু শুনে বিচারক তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পাবনা মানসিক হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর খলিলুল্লাহ সম্পুর্ণ সুস্থ্য হয়ে ওঠে। ফিরে যায় নরসিংদী এলাকায় নিজ গ্রামে। মানুষের গোশ্ত ও কলিজা খাবার কথা জানাজানি হওয়ায় নিজ গ্রামে তার ঠাঁই হয়না। সে ঢাকা চলে আসে। কিন্তু পুর্বের অপবাদ তার পিছু ছাড়েনা। কোথাও গেলে তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো। ঘৃণায় তাকে কেউ কোন কাজ দিতোনা। সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে অবশেষে সে ভিক্ষার পথ বেছে নেয়। আজিমপুর কবরস্থানের গেটে বসে অন্যান্য ভিক্ষুকদের সঙ্গে ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করে। জানা যায় কমলা নামে এক ভিখারীনিকে সে বিয়ে করে সংসার পাতে। সে কামরাঙ্গীর চরে এক বস্তিতে বসবাস করতো। তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসার গড়ে তোলে। এজন আদর্শ সংসারি হিসেবে খলিলুল্লাহ জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করে। ২০০৫ সালে সে মৃত্যুবরণ করে। ‘‘ লেখকের ফেলে আসা দিনগুলো পান্ডুলিপি থেকে নেওয়া’’ (লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখঃ ২৮/০৫/২০২৫
