ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ–ব্রিজিত সম্পর্কের অজানা অধ্যায়

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ও ফার্স্ট লেডি ব্রিজিত মাখোঁর সম্পর্কটি শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও বহু বিতর্ক ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। তাদের বয়সের পার্থক্য, সামাজিক অবস্থান ও সম্পর্কের শুরুর সময়কাল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে, ফরাসি সাংবাদিক সিলভি বোমেলের লেখা ‘ইল ভেনেই দাভোয়ার ডিজ-সেত আন’ বইটি এই সম্পর্কের অজানা দিকগুলো উন্মোচন করেছে।

১৯৯৩ সালে, ফ্রান্সের আমিয়েঁ শহরের লা প্রভিডেন্স স্কুলে ব্রিজিত ছিলেন ফরাসি ভাষা ও নাট্যকলা শিক্ষক। এমন সময় ১৫ বছর বয়সী ইমানুয়েল মাক্রোঁ তার ছাত্র হিসেবে ওই স্কুলে ভর্তি হন। ব্রিজিতের মেয়ে লরেন্সও তার সহপাঠী ছিলেন। স্কুলের নাট্যদলে একসঙ্গে কাজ করতে করতে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটি ছিল একটি অস্বাভাবিক সম্পর্ক, কারণ ব্রিজিত তখন ৩৯ বছর বয়সী ও বিবাহিত, এবং মাক্রোঁ ছিলেন কিশোর।

এই সম্পর্কটি স্থানীয় সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা তাদের সম্পর্ক নিয়ে চিঠি লিখে অভিযোগ জানায়। মাক্রোঁর বাবা-মা ব্রিজিতকে সরাসরি বলেন, তিনি যেন তাদের ছেলেকে ছেড়ে দেন। ফরাসি আইন অনুযায়ী, শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বাস্তবে মাক্রোঁর মা–বাবা, স্কুল প্রধান বা কারও পক্ষ থেকেই কোনো তদন্তের দাবি ওঠেনি। এমনকি তাঁরা খতিয়ে দেখতেও চাননি যে ছেলেটি ও শিক্ষিকার সম্পর্ক শুধু ‘হাত ধরা’ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল কি না।

এরপর মাক্রোঁর বাবা মা তাকে প্যারিসে পাঠিয়ে দেন এই আশায় যে সম্পর্কটি নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। মাক্রোঁ তার পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় একটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্রিজিত, তখনো ‘ম্যাডাম ওজিয়ের’ হিসেবে পরিচিত, সন্তানদের লালন-পালন করতে থাকেন এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। তখন ব্রিজিতের স্বামী আন্দ্রে-লুই ওজিয়েরের বেশির ভাগ সময় কাটতো কর্মস্থলের বাইরে। সপ্তাহান্তে বাড়ি ফিরলেও তখন অনেক সময় স্ত্রী নিজের প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করার জন্য বাইরে থাকতেন। তবে ওজিয়ের দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ হয় ২০০৬ সালে, আর ব্রিজিত এর এক বছর পর ২০০৭ সালে আবার বিয়ে করেন।

২০০৬ সালে ব্রিজিত তার স্বামী আন্দ্রে-লুই ওজিয়েরের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। এক বছর পর, ২০০৭ সালে তিনি মাক্রোঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্রিজিত বলেন, ‘শুধু আমার সন্তানদের জন্য আমি ১০ বছর অপেক্ষা করেছি, যাতে তাদের জীবন নষ্ট না হয়।’

মাক্রোঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ব্রিজিতের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা, বক্তৃতা লেখক ও জনসংযোগের অংশীদার হিসেবে কাজ করেছেন। মাক্রোঁ যখন ২০১৪ সালে অর্থমন্ত্রী হন, তখনও ব্রিজিত তার পাশে ছিলেন। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, তিনি প্রথম ফাস্ট লেডি হিসেবে তার দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুজব ও সমালোচনা উঠেছে। কিছু গুজবে বলা হয়, মাক্রোঁ সমকামী, আবার কিছুতে বলা হয়, ব্রিজিত আজীবন তরুণ ছেলেদের প্রেমে পড়েন। ব্রিজিত বলেন, ‘তিনি জানতেন না, তিনি কি তার স্ত্রীর প্রতি এতই উৎসর্গিত যে অন্য কারও দিকে তাকানোর সময় পান না, নাকি তিনি একেবারে যৌন আকর্ষণহীন।’

বর্তমানে, মাক্রোঁ ও ব্রিজিত একসঙ্গে সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা তাদের রাজনৈতিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্রিজিত বলেন, ‘তিনি জানেন তিনি কী চান, যা চান সেটা পান এবং তিনি একজন স্বাধীন মানুষ।’

কিন্তু ব্রিজিতের প্রথম স্বামী ওজিয়ের সম্পর্কে কোনো তথ্য খুঁজে পাননি লেখিকা। বরং তাঁর বিশ্বাস, মাক্রোঁর উপদেষ্টারা হয়তো তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। বোমেল বলেন, ‘যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো ইন্টারনেটে তাঁর সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। আমি ভাবি, নির্বাচনী প্রচারের সময় কেউ হয়তো এসব তথ্য ‘ছেঁটে ফেলা’র অনুরোধ করেছিলেন। ফ্রান্সের একটি বড় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকা সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার।’

লেখিকা বোমেল মনে করেন, ওজিয়ের ৬৮ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করে এখন প্যারিসে বসবাস করছেন। এমন হতে পারে যে ওজিয়ের নিজেই বিষয়গুলো গোপন রাখছেন। ৩৫ বছর বয়সী টিফেন ওজিয়ের ব্রিজিত তাঁদের ছোট মেয়ে। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘তাঁরা ভালো আছেন, তবে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার মধ্যে থাকতে চান।’

এই সম্পর্কটি শুধুমাত্র একটি প্রেম কাহিনী নয়, বরং এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, সম্পর্কের নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র: দ্য টাইমস