নাটোরের বাগাতিপাড়ায় ৫’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঘার ঈদমেলায় হাজারো মানুষের ঢল

নাটোর প্রতিনিধি .
নাটোরের বাগাতিপাড়ায় তমালতলা এলাকায় অবস্থিত ৫’শ বছরেরও বেশি দিন যাবৎ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ঐতিহ্যবাহী বড়বাঘায় ঐতিহাসিক ঈদ মেলা। এবছরো ১৫ দিনব্যাপী এ মেলা শুরু হয়েছে ঈদুল ফিতরের দিন থেকে।বড় বাঘা নামে পরিচিত ওই মাজার চত্বরে অনুষ্ঠিত মেলা দেখা ও আনন্দ উপভোগ করার জন্য দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসছে হাজারো নারী পুরুষ । সরেজমিনে বুধবার বিকালে মেলায় গিয়ে দেখা যায় ঈদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য মেলায় নেমেছে হাজারো মানুষের ঢল । জানা যায়, এর আগে ঈদের দিন নামাজ শেষে থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মেলায় আসতে শুরু করে হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া মেলায় পসরা নিয়ে বসেছেন শত শত ব্যবসায়ীরাও । ঈদ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত এই মেলায় সব সম্প্রদায়ের মানুষই আসে। মেলাই পাওয়া যাচ্ছে সব ধরনে মিষ্টি, বাচ্চাদের খেলনা, মনোহারি সামগ্রী, লোহাজাত দ্রব্য, কাঠের আলনা, চেয়ার, টেবিল, খাট, ড্রেসিং টেবিল, পালঙ্ক, শোকেচ, মাটির হাড়ি পাতিল, প্রসাধনী সামগ্রী, মাংস, বেকারি দ্রব্যাদি, শামুকের মালা, কাঠের সামগ্রী, বেলুন, বাঁশি। এ ছাড়া রয়েছে ছবির দোকান, খাবার হোটেল, সদর ঘাটের পান, চা স্টল, নাগর দোলা প্রভৃতি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের শাসন আমলে বাগদাদ থেকে হযরত শাহ সুফি মাওলানা মোবারক দানেশ মান্দ বিন হামিদ বিন দোল্লা বিন আব্বাস (রা.) কয়েকজন সঙ্গীসহ এই এলাকায় এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। এবং বসবাস শুরু করেছিলেন নাটোর থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে উপজেলার সাড়ে তিন কিঃমিঃ উত্তর-পশ্চিম কোণে। সেসময় জায়গাটি ছিল জঙ্গল। সেখান থেকেই তিনি ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন। কথিত আছে, তিনি মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎ বলতে পারতেন। সেজন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে মানুষ আসত এবং ইসলামের বিভিন্ন দীক্ষা নিতেন তাঁর নিকট থেকে। আরও জানা যায়, তাঁর এবং সঙ্গীদের মৃত্যুর পরে জায়গাটির নামকরন হয় বড় বাঘা। সেখানে সরকারি ও এলাকাবাসীর দানকরা জমিতে গড়ে উঠে একটি মসজিদ, ঈদগাহ, মাজার শরীফ, হেফজ মাদরাসা। আর সেখানেই প্রতি বছর ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে তিন থেকে সাত দিন এবং পরে তা বৃদ্ধি করে পনেরোদিন ব্যাপী ঈদ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর ওই মেলা থেকে যা আয় হয় তা থেকে হেফজ মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, ছাত্র-ছাত্রীদের খরচ ও উন্নয়ন মূলক কাজ করা হয়। পাশ^বর্তী উপজেলা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় আসা আনিসুজ্জামান বলেন, ছোটবেলায় আব্বার সঙ্গে মেলায় আসতাম। বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি, খেলনা কিনে দিতো আব্বা। এখন আব্বা বেঁচে নেই। ছেলে-মেয়ে, বউকে নিয়ে ঈদে মেলায় আসি। এখানে আসলে খুব ভালো অনুভব করি। অনেক পুরোনো স্মৃতি রোমান্থনের পথ খুলে দেয় এই মেলা। শারমিন সুলতানা নামে এক তরুণী বলেন, ছোটবেলা থেকে আব্বু ও ভাইয়ার সঙ্গে মেলায় আসা হয়। বিগত ৬/৭ বছর মেলায় ঘুরতে আসি। বিশেষ করে ঈদের দিন যেদিন মেলা শুরু হয় ও ঈদের পরের দিনগুলোতে। এই মেলায় হরেক রকমের জিনিসপত্র অনেক কম দামে পাওয়া যায়। মেলায় ঘুরতে আসা দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া শিক্ষার্থী মরিয়ম বলেন, আমি এই মেলা থেকে অনেক খেলনা কিনেছি আমার মেলায় এসে খুব ভালো লাগছে। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা কাঠের আসবাবের দোকানি মঈনুদ্দীন বলেন, আমি ১৩ বছর ধরে এই মেলায় দোকান দেই। এরআগে আমার বাবা দোকান বসাতো। একই স্থানে আমি এখন বেচাকেনা করছি। ১৫ দিনের মেলায় খরচ বরচ বাদ দিলেও ভালোই লাভ থাকে বলেও তিনি জানান। বড় বাঘা মসজিদ, মাদরাসা ও মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় ৫’শ বছরেরও বেশি দিন যাবৎ ঈদুল ফিতরের দিন এই মেলা শুরু হয়ে তিন থেকে পনেরো দিন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটা একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা। এখানে কিছু রীতি মেনে চলা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে মেলায় যাতে ঐতিহ্য ফুটে ওঠে সেদিকে খেয়াল রাখছি আমরা।তিনি আরও বলেন, মেলায় যাতে কোনো প্রকার অশ্লীলতা না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থারও কমতি নেই। অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আশা করি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে মেলায় আনন্দ উপভোগ করবে মেলায় আসা দর্শনার্থীরা।