এবাদত আলী
মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর জলিলুল কদর সাহাবী ও ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.) কে একদল বিদ্রেহী উম্মা হত্যা করেন। এরপর হজরত ওসমান (রা.) এর ঘনিষ্ট কেউ খেলাফতের দাবির সাহস করেননি। বিদ্রোহী মুসলিম উম্মাহ ্একমাত্র হজরত আলী (রা.) কে খেলাফতের প্রস্তাব দিলে প্রথমে তিনি তাতে অসম্মতি জানান। পরবর্তীতে মুসলিম উম্মার চাপে বা বিশেষ অনুরোধে হজরত আলী (রা.) খেলাফত গ্রহণে রাজি হন। এইভাবে হজরত আলী (রা.) চতুর্থ খলিফা নি যুক্ত হন।
হজরত আলী (রা.) মক্কার একটি সন্মানিত কুরাইশ পরিবারে আনুমানিক ৬০১ খিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতা আবু তালিব কুরাইশ গোত্রের একটি শক্তিশালী শাখা বনু হাশিমের প্রধান ছিলেন এবং কাবা ঘর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। হজরত আলী (রা.) এর দাদাও হাশিম বংশের অন্য অনেক সদস্যের মত হানিফ ছিলেন অর্থাৎ ইসলামের আগে থেকেই এক ঈশ^রবাদী বিশ^াসে বিশ^াসী ছিলেন।
হজরত আলী ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবার অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা ছিলেন ফাতিমা বিনতে আসাদ। আবু তালিবের স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ ১৩ রজব শুক্রবার কাবা শরীফের সামনে দাড়িয়ে আল্লাহর কাছে তার যন্ত্রণা দুর করার জন্য প্রর্থনা করছিলেন। হঠাৎ কাবার দরজা নিজ থেকে খুলে গেল এবং তিনি অনুভব করলেন কোন অদৃশ্য বাহিনী তাকে কাবার ভেতরে প্রবেশ করালেন। সেখানে তিনি এক অলৌকিক ঘটনায় এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। হজরত আলীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কাবার অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি এবং তার মাতা তিনদিন কাবার ভেতরে অবস্থান করেছিলেন। এরপর তারা বের হয়ে আসার পর হজরত মোহাম্মদ (সা.) তাদের স্বাগত জানান এবং শিশুটির নাম রাখেন ‘আলী’ যার অর্থ সমুন্নত।
প্রায় পাঁচ বছর বয়সে হজরত আলীকে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং তার স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) তাদের কাছে নিয়ে যান এবং তাকে লালন-পালন করেন। হজরত মোহাম্মদ (সা.) প্রথমে যখন ওহি পেয়েছিলেন তখন হজরত আলী মাত্র ১১ বছর বয়সে বিশ^াস সহকারে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণকারি প্রথম পুরুষ। হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে হজরত আলী তার পাশে ছিলেন। তিনি মুসলমানদের প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং একজন অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বদরের যুদ্ধে তার বীরত্বের জন্য হজরত মোহাম্মদ (সা.) তাকে জুলফিকার নামক তরবারি উপহার দিয়েছিলেন। খাইবার যুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের জন্য হজরত মোহাম্মদ; (সা.) তাকে আসাদুল্লাহ বা আল্লাহর সিংহ উপাধি দিয়েছিলেন। বিদায় হজের ভাষণের পর ‘গাদীরে খুম ’এর ভাষণে হজরত মোহাম্মদ (সা.) তাকে মুমিনদের ‘‘মওলা ’’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
মক্কার লোকদের মধ্যে অনেকেই মহানবী (সা.) ্এর বিরোধিতা করলেও হজরত আলী কখনো তার বিরোধিতা করেননি বরং প্রতিটি প্রতিকুলতার সময় তিনি মহানবী (সা.) এর ঢাল হিসেবে পাশে দাড়িয়েছিলেন। একসময় মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের ওপর শত্রুদের বর্জনের সিদ্ধান্ত কঠোর হয়ে ওঠে। তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে হজরত মোহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর নির্দেশে মক্কা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। হিজরতের রাতে তিনি হজরত আলীকে তার বিছানায় শোয়ার নির্দেশ দেন। হজরত আলী অতি আনন্দের সঙ্গে সেই আদেশ মান্য করেন। মহানবী (সা.) এর নিকট লোকজনের গচ্ছিত সম্পত্তি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে রাতে হজরত আলী নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র বিছানায় শায়িত হন। কাফেররা ভেবেছিলো মোহাম্মদ ঘরে আছেন এবং তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্ত হজরত আলীর অসীম সাহসিকতার কারণে তাদের সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) হজরত আবু বকর সিদ্দিককে সঙ্গে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে মদীনার পথে রওনা হন এবং নিরাপদে মদীনা শরীফে পৌঁছান।
হজরত আলী তার নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে মহানবী (সা.) এর খেদমতে নিবেদিত ছিলেন। তিনি গচ্ছিত সম্পদ সফলভাবে মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দিয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাদের মধ্যে ছিলেন তার মাতা ফাতিমা বিনতে আসাদ, তার খালা, হামজার স্ত্রী, নবী (সা.) এর কন্য ফাতিমা এবং অন্যান্য নারী। মক্কার কাফেররা হজরত আলীকে থামানোর চেষ্টা করেছিলো কিন্তু হজরত আলী তাদের সঙ্গে লড়াই করে যাত্রা নিশ্চিত করেন। অবশেষে তারা মদীনায় পৌছান। মহানবী (সা.) মদীনার বাইরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছরে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) তার কন্যা ফাতিমাকে হজরত আলীর সঙ্গে বিবাহ দেন। তখন হজরত আলীর বয়স প্রায় ২৩ বছর এবং হজরত ফাতিমা (রা.) এর বয়স ১৮ বছর। তাদের দুই পুত্র সন্তানের নাম হজরত হাসান(আল হাসান ইবনে আলী ইবনে আবি তালীব) এবং হোসাইন (হোসাইন ইবনে আলী )
হজরত আলী (রা.) চতুর্থ খলিফা হিসেবে খিলাফত লাভের পর রাজধানী মদীনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেন। এদিকে হজরত ওসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মুসলিম উম্মাহকে গ্রেফতার না করায় হজরত মুয়াবিয়া এবং উম্মুল মোমেনিন হজরত আয়েশা (রা.) হজরত আলী (রা.) কে হজরত ওসমান (রা.) হত্যার জন্য দায়ী করেন। হজরত আয়েশা (রা.) এতটাই হজরত আলী (রা.) এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন যে, হজরত ওসমান (রা.) এর রক্তের প্রতিশোধ নিতে সাহাবা হজরত তালহা (রা.) ও যুবায়ের (রা.) সহ কয়েকজন সাহাবা এবং প্রায় তিন হাজার যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে বসরা অভিমুখে রওনা হন। সেখানে তারা প্রয় ছয়শ মুসলিমকে হত্যা করেন। বসরার যুদ্ধে হাজারো মুসলিম প্রাণ হারান। হজরত আয়েশা (রা.) এর উট আহত হলে তিনি উট থেকে পড়ে যান। সৌভাগ্যবশতঃ তিনি অক্ষত ছিলেন। হজরত আলী (রা.) হজরত আয়েশা (রা.) এর ভাই হজরত আবু বক্কর (রা.) কে নির্দেশ দেন হজরত আয়েশা (রা.) কে স্বসন্মানে মদীনায় পৌঁছানোর। এদিকে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) একই অভিযোগে হজরত আলী (রা.) এর বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কানি দিতে থাকেন। ফলে ‘শিফফিন’ নামক স্থানে উভয়পক্ষের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বহুসংখ্যক যোদ্ধা নিহত হন। হজরত মুয়াবিয়া (রা.) নিশ্চিত পরাজয় জেনে এক অভিনব প্রতারনার আশ্রয় নেন। হজরত মুয়াবিয়ার পক্ষে প্রায় পাঁচ’শ পবিত্র কোরআন বর্ষার অগ্রে উঁচু করে ধরেন। ফলে হজরত আলী (রা.) এর পক্ষের যোদ্ধারা যুদ্ধ করতে ইতঃস্তত করেন।
হজরত আলী (রা.) এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ক্রমেই দানা বাধতে থাকে। হজরত আলী (রা.) কে হত্যার পরিকল্পনা হতে থাকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফজরের নামাজের ইমামতিকালে খারিজী, ইবনে মুজলিম হজরত আলী (রা.)কে বিষাক্ত বিষ মাখা তরবারি দ্বারা আঘাত করে গুরুতর আহত করে। এ ঘটনার দুই দিন পর ৪০ জিরীর ২১ রমজান হজরত আলী (রা.) ইন্তেকাল করেন। এই সময় তার ৩৭ বছর বয়সী বড় ছেলে আল হাসান (রা.) কে ইমামতি হস্তান্তর করেন।
(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।
এবাদত আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব
তারিখ: ২১/০৩/২০২৫.
