॥ এবিএম ফজলুর রহমান॥
উন্নত বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আধুনিক অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তির উৎকর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি উন্নত বিশ্ব মানে নিরাপদ জীবন, দূষণমুক্ত পরিবেশ, জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, মানসম্মত পণ্য ও সেবা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করা। আর এসব লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো মানসম্মত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির কার্যকর ব্যবহার। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে আগামী ১৪ অক্টোবর পাবনাসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হবে বিশ্ব মান দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য-‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’। প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
দিবসটির তাৎপর্য বিবেচনায় ১৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টায় পাবনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বিএসটিআই পাবনা আঞ্চলিক অফিসের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনায় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পাবনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আমিনুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পাবনা জেলা পরিষদ প্রশাসক মোহাম্ম জহুরুল ইসলাম বিশু, পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ। অনুষ্ঠানে মুল প্রবন্ধ পাঠ করবেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো: ফিরোজ আলী। পাবনার শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ক্যাব ও গণমাধ্যম কর্মিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
বিশ্ব আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ; অন্যদিকে বাড়ছে জ্বালানির চাহিদা, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং পরিবেশদূষণের চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা পরিচালনা, পরিবহন ও গৃহস্থালির কাজে জ্বালানির ব্যবহার ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু জ্বালানির অপরিকল্পিত ব্যবহার, পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা এবং অপচয় আমাদের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে এখন প্রয়োজন জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির প্রসার।
এখানে মানের গুরুত্ব অপরিসীম। মানসম্মত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি জ্বালানির অপচয় কমাতে পারে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব হ্রাসে সহায়তা করতে পারে। একটি শিল্পকারখানায় দক্ষ মোটর, আধুনিক বয়লার, উন্নত বিদ্যুৎব্যবস্থা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে একই পরিমাণ উৎপাদনে তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যয় করা সম্ভব। একইভাবে মানসম্মত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, জ্বালানিসাশ্রয়ী বাতি, উন্নত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সৌরবিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমাতে পারে। ফলে মান নিশ্চিত করা শুধু পণ্যের উৎকর্ষ অর্জনের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সাশ্রয়, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সংরক্ষণেরও অন্যতম পুর্বশর্ত।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিল্পায়ন, কৃষি উৎপাদন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নগরজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির অপচয় কমানো, দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
পাবনায় বিশ্ব মান দিবসের আয়োজনকে কেবল আলোচনা সভা, র্যালি কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবমুখী কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মান ও জ্বালানি সাশ্রয়বিষয়ক সচেতনতামূলক আলোচনা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে মতবিনিময়, ব্যবসায়ীদের মানসম্মত পণ্য বিক্রিতে উদ্বুদ্ধকরণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ সমন্বিতভাবে কাজ করলে দিবসটির তাৎপর্য আরও গভীর হবে।
এখানে বিএসটিআইয়ের দায়িত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পণ্য ও সেবার মান নিশ্চিত করা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানসনদ প্রদান, বাজারে মানসংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানদণ্ড বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি উৎপাদক ও আমদানিকারকদের মানসম্মত পণ্য বাজারজাত করতে উৎসাহিত করা এবং ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মানের বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করলে তার প্রভাব শুধু একজন ভোক্তার ওপর পড়ে না; বরং সামগ্রিক অর্থনীতি, জননিরাপত্তা ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রসারকে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন, ভোগের ধরন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধও গভীরভাবে জড়িত। আমরা কতটা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি, অপ্রয়োজনীয় শক্তি ব্যয় করছি কি না, পরিবেশের ক্ষতি কমাতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছি-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ে। পরিবার থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়-সবখানেই জ্বালানি সাশ্রয় ও মানসম্মত ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্ব মান দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে তুলে ধরছে। ‘অভিন্ন লক্ষ্য উন্নত বিশ্ব-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি’ প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে একই সূত্রে গাঁথতে হবে। দিবসটি পালনের সার্থকতা তখনই অর্জিত হবে, যখন এর বার্তা আমাদের নীতি, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।
বিএসটিআই পাবনা আঞ্চলিক অফিসের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, দেশের ১০ জেলায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিএসটিআইয়ের নতুন ভবন ও ল্যাবরেটরি নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় বৃহত্তর পাবনা জেলার ১৮টি উপজেলার উৎপাদিত পন্য সামগ্রীর জন্য পাবনা শহরের বালিয়াহালটে প্রধান সড়কের পাশে ৫৬ শতাংশ জায়গার উপর ৫তলা ভবন নির্মতি হবে। ফলে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ শতকরা ৯৫ থেকে ৯৮ ভাগ পণ্যের গুণগম মান পরীক্ষা সম্ভব হবে। সবচেয়ে খুশির বিষয় ; তাঁত অধ্যুষিত এই এলাকায় কাপড়, রংসহ অন্যান্য অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যোর মান পরীক্ষা সম্ভব। উন্নত বিশ্ব গড়ার অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে মানের বিকল্প নেই, আর সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিই হতে পারে সেই অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান শক্তি। লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, সভাপতি কনজুমার অ্যাসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ (ক্যাব), পাবনা জেলা শাখা ও সাবেক সভাপতি পাবনা প্রেসক্লাব।
