গরু কাহিনী

এবাদত আলী
আমাদের গৃহপালিত যে সকল পশু রয়েছে তার মধ্যে গরুর কদর সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
প্রকার ভেদে গরুকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়, যেমস গাভী, দামড়া, বলদ. ষাঁড় ও বাছুর। গরুর মত এমন উপকারি প্রাণি আর দ্বিতীয়টি আছে কি-না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ গরু দ্বারা লাঙল টেনে জমি চাষ করা হয়। যত্র তত্র গরু জবাই করে তার গোস্ত ভক্ষণ করা হয়। প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহার সময় গরু কোরবানি করা হয়। গরুর গোবরকে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। গোবর দ্বারা বায়োগ্যাস প্রকল্পের মাধ্যমে রান্না-বান্নাসহ আলো জ্বালানো যায়। গাভীর দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য যেমন ছানা, পনির, ঘৃত ইত্যাদি ভক্ষণে আমরা তৃপ্ত হই।
গরু অতি নিরীহ প্রাণি। তবে কেউ বিরক্ত করলে শিং দ্বারা গুতায়। গরুর সঙ্গে তুলনা করে কিংবা গরুকে উপমা হিসাবে যদি কাউকে ব্যাটা গরু কোথাকার অথবা গরুর জাতি সত্তায় আঘাত করে কাউকে যদি বলা হয় গো-মুর্খ¬ তাহলে সে মারমুখি হয়ে ওঠে। তখন সে ব্যক্তিটি অবশ্যই ফোঁস করে তেড়ে আসে। আমাদের দেশে একটি প্রবাদবাক্য আছে জুতা মেরে গরু দান, অর্থাৎ অপমান অপদস্থ করার পর কাউকে পুনরায় আদর করা। কাউকে যদি বলা হয় গরুর মত মোটা কিংবা ধর্মের ষাঁড়; তাহলে তো কথাই নেই- সঙ্গে সঙ্গে দু’ঘা বসিয়ে দেবে। মুক্তভাবে বিচরণশীল ষাঁড়ের ন্যায় স্বেচ্ছাচারি ব্যক্তিকে বলা হয় গকুলের ষাঁড়। গরুর জাত নিয়ে টানাটানি করে অনেকেই উপদেশবাণী শোনায়। যেমন বলা হয় দুষ্ট এঁড়ের চেয়ে শুন্য গোয়াল ভাল। গো-ভাগাড়ে গিয়ে মর বলেও অনেককে আবার তিরস্কার করা হয়ে থাকে। গরুকে যে ঘরে রাখা হয় তাকে বলা হয় গো’শালা। গরু নির্বোধ প্রাণি বলেই হয়তো এরা প্রতিবাদ করে না। তাছাড়া হাতির মত ইয়াবড় জন্তুর আবাসস্থলকে যখন হাতিশালা বলা হয় তখন “গো’শালা” শব্দ নিয়ে গরুর কোন মাথা ব্যথ্যা নেই।
পড়ন্ত বিকেলে গরুর পাল হেঁেট গেলে যে ধুলা ওড়ে তাকে কবি-সাহিত্যিকগণ নাম দিয়েছেন গোধুলি। কিন্তু ঐ পথে মানুষ ঁেহটে গেলে এবং তা থেকে ধুলা উড়লে মানব ধুলি কেই বলে না। আসলে গরুরা নির্বোধ বলে এরা কোন প্রতিবাদ করে না।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম “দে গরুর গা ধুয়ে” বলে ব্যঙ্গ করে গান লিখেছিলেন এবং হিজ মাষ্টারস ভয়েস কোম্পানিতে তা রেকর্ড করিয়ে গ্রামোফোনে বাজিয়েছিলেন। গরুকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করতে তিনিও কম যাননি। মানব জাতি কারনে অকারনে গরুকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। কথায় বলে ‘মানুষের শত্রæ মানুষ আর গরুর শত্রæ কায়ে (কাক), আর কিছু না পারলে ঠোকায়ে করে ঘায়ে’ । মুখ গহŸর বড় করে অর্থাৎ বড় বড় গ্রাস করে খাদ্য ভক্ষণ করলে তাকে বলা হয় গোগ্রাস। যে সাপের ফণায় গরুর খুরের মত দাগ আছে সে সাপকে বলা হয় গোখরা সাপ। নির্বোধ গরু অপরের ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেল্লে¬, ক্ষেতের মালিক গরুকে খোয়াড়ে দেয়। আসলে খোয়াড়ে তো গরুর মালিককেই দেয়া উচিত। কারন গরু নির্বোধ বলে তার কাছে আপন-পরের কোন বালাই নেই।
তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর এ দেশের দালাল, রাজাকার, আল শামস, আল বদর বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দিতে গরুও কিন্তু কুন্ঠাবোধ করেনি। এমনি একটি অজাচিত ঘটনা ঘটে পাবনা শহরের নুরপর ডকবাংলো মিলিটারি ক্যাম্পে। স্থানিয় দালালেরা পাকিস্তানি আর্মিদেরকে তুষ্ট করার জন্য রাজাকারদের মাধ্যমে গৃহস্তের বাড়ি থেকে জোর পুর্বক একটি ষাঁড় গরু নিয়ে এসে জবাই করে দুপুর বেলা ভুড়ি ভোজের আয়োজন করে। নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগে আর্মি ক্যাম্পের বিশাল ত্রিপলের নিচে খাবার সমূহ টেবিলে থরে থরে সাজানো হয়। এক পাশে আর্মি অফিসার ও পিস কমিটির দালাল, অপর পাশে রাজাকার, আল বদরেরা বসে কেবলই দু এক লোকমা খাবার মুখে দিয়েছে, ঠিক সেই মূহুর্তে বালিয়াহালটের জনৈক ব্যক্তির একটি ষাঁড় গরু দড়ি ছিঁড়ে লাফাতে লাফাতে হঠাৎ করে আর্মি ক্যাম্পের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ষাঁড় গরুটি শিঙের গুতায় মেইন গেটের দুই সিকিউরিটি গার্ডকে জখম করে খাবারের মজলিসে গিয়ে হাজির হয়। পাকিস্তানি আর্মি অফিসারসহ পিস কমিটির দালাল রাজাকারেরা এহেন আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব। গরুটি মূহুর্তের মধ্যে খাবার টেবিলে রক্ষিত পোলাও সাদা ভাত, আলু ভর্তা, বেগুন ভাজি, গরুর গোস্ত, মুরগির রোস্ট, রেজালা, ভুনা গোস্ত, কিমা, আচার, ডাউল, পায়েস, দইসহ বিভিন্ন পদের খাবার শিঙের গুতায় লন্ড-ভন্ড করে দেয়। ধারালো শিঙের গুতায় আর্মি অফিসার, পিস কমিটির দালাল, রাজাকারসহ সকলের উপরই আক্রমণ চালায়। খাবারের টেবিল ঢুঁ মেরে মেরে উল্টে ফেলে। এ ঘটনায় অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হয়। পাকিস্তানি আর্মি অফিসার শিঙের গুতায় আহত অবস্থায় পিস কমিটির চেয়ারম্যানকে বলে, ‘‘ চেয়ারম্যান ছাহাব ইয়ে গরু বহুত খতরনাক গরু হায়। উ ভি মুক্তি গরু হায়?
পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই গরু আছে, তাই গরুর কদর সর্বত্র। রামায়নে উল্লেখ আছে, ভারতের সরযু নদীর তীরে অযোধ্যা নগরের রাজা দশরথের পুত্র রাম, সীতা নামের যে কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন; রামের শশুর অর্থাৎ মিশিলার জনক রাজা যিনি গরু দ্বারা লাঙ্গল বাইতে গিয়ে লাঙ্গলের ফলায় সীতাকে পেয়েছিলেন। সেই পালিত কন্যার বিয়ের সময় মেয়ে জামাইকে এক লাখ গরু উপঢৌকন হিসাবে প্রদান করেছিলেন।
বিগত ১৯৯৮ ইং সালের জুন মাসে দক্ষিন কোরিয়ার সেরা ধনী হুন্ডাই গ্রæপের মালিক চুং-জু-ইয়ং উত্তর কোরিয়া সফরকালে ৫শটি গরুর একটি পাল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে কড়া প্রহরাধীন সীমান্ত অতিক্রম করে তিনি গরু গুলো উত্তর কোরিয়াকে উপঢৌকন হিসাবে দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে এক কালে কৃষকের গোয়াল ভরা গরু ছিলো। সে সময়ের কবি গানে বয়াতিরা গাইতো, “গাভীর শোভা লালটি বাছুর ঘোরে আরো ফেরে” -“নারীর শোভা কাঞ্ছা ছেলে মায়ের আচল ধরে টানে”।
পরবর্তীকালে এদেশে গরুর ঘাটতি হতে থাকে। অভাবের তাড়নায় কৃষকেরা হালের বলদ ও দুধেল গাই বিক্রি করে তাদের অভাব মিটাতে গিয়ে অধিকাংশ কৃষকের গোয়ালই গরু শুন্য হয়ে পড়ে। এখন যা আছে তা হলো পাশাপাশি গাভীর দুগ্ধ পান করার সৌহার্দতার কারণেই হয়তো বা এদের এখনো ভাগাড়ে পাঠানো হয়নি। গরু নিরীহ ও নির্বোধ প্রাণি বলেই এক শ্রেণির কসাই মাংস বিক্রির আশায় গরুকে আদর করে চার পা বেঁধে শুইয়ে গলায় ছুরি চালায়। গরু নির্বোধ বলে প্রথমে বিষয়টিকে তত গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে পারে না। কারণ যে দেশের মানুষ-মানুষের গলায় ছুরি চালায়। গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। মায়ের পেটের অবলা শিশু এই ধরাধামে আগমণের পূর্বেই গুলির শিকার হয়। যে দেশে হাত পায়ের রগ কাটা হয়, যে দেশে শিশুদেরকে ধর্ষণ পূর্বক ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সে দেশের গরুর গলায় ছুরি চালানো অতি সহজ কাজ। গরু নির্বোধ প্রাণি তাই চুপ করে থাকে, ছুরির নিচে গলা বাড়িয়ে ধরে আর হয়তো কবির ভাষায় মনে মনে বলে,-
“এ জগতে যত ব্যাটা
সব ব্যাটা গরু
যে যারে ঠকাতে পারে
সেই তার গুরু। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

এবাদত আলী
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আটঘরিয়া প্রেসক্লাব ও
সদস্য পাবনা প্রেসক্লাব ।
তারিখ: ১০// ১০ // ২০২৬.