একই পদে ১৪ বছর ঈশ্বরদীর পৌর নির্বাহী, অভিযোগের পাহাড়

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি:
সরকারি কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে না রাখার নীতিমালা থাকলেও পাবনার ঈশ্বরদী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলাম প্রায় ১৫ বছর ধরে একই কর্মস্থলে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন একই পদে থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, জহুরুল ইসলাম ২০১১ সালে ঈশ্বরদী পৌরসভার সচিব হিসেবে যোগ দেন। পরে পদটির নাম পরিবর্তন হয়ে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হলেও তিনি একই কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকার বিষয়টি নিয়ে পৌরসভা ও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঈশ্বরদীর আলহাজ্ব আবুল মনসুর খান স্টেডিয়ামে খেলাধুলা বন্ধ রেখে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাঠ ভাড়া দেওয়া, সেখানে নির্মাণসামগ্রী রাখার অনুমতি এবং অরণকোলা পশুর হাটের জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরিতে যোগসাজশের। এ ছাড়া ‘স্মার্ট প্রকল্পের’ নামে নাগরিকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০০ টাকা আদায় করেও সেবা না দেওয়া, অযৌক্তিকভাবে পৌরকর বৃদ্ধি এবং পৌর ট্রাক টার্মিনালের ময়লার ভাগাড় ভরাটের মাটি বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে জহুরুল ইসলামের প্রভাব ও কর্তৃত্ব বেড়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে পৌরসভার গাড়ি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক তাঁর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দাবি, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় এবং প্রভাবশালীদের নিজের পক্ষে রেখে তিনি পদে টিকে আছেন। এমনকি পৌরসভার বিলাসবহুল গাড়িও তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বৈরাচারী সরকারের আমলে কথিত ‘রাতের ভোটে’ মেয়র নির্বাচিত হন ইসাহক আলী মালিথা। অভিযোগ রয়েছে, এরপর পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম ধীরে ধীরে পৌরসভার কর্মকাণ্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। মেয়রকে বিভিন্নভাবে ভুল বুঝিয়ে একদিকে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা আদায়, অন্যদিকে পৌরবাসীকে কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৪ জুন পাবনা জেলা সমন্বিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঈশ্বরদী পৌরসভা কার্যালয়ে দিনব্যাপী অভিযান চালায়। অভিযানকারী দলের পক্ষ থেকে পৌরসভার বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

দুদক সূত্রের দাবি, নিয়মবহির্ভাবে জমি হস্তান্তর ও দুর্নীতিসহ জহুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৮-১০টি মামলা হয়েছে। আরও ৩-৪টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

পৌরসভার কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন একই পদে থাকার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি পৌরসভার বিভিন্ন অনিয়মেরও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তাদের বদলি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

উন্নয়ন সংস্থা নিউ এরা ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোস্তাক আহমেদ কিরন বলেন, “একজন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে যদি পৌরসভার ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। জনপ্রতিনিধিকে ভুল বুঝিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং নাগরিকদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

পৌরসভা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। মেয়রসহ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জবাবদিহির মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দীর্ঘদিন একই পদে থাকার কারণে যদি কোনো কর্মকর্তা অঘোষিতভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে পৌরবাসীর নাগরিক অধিকার ও সেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত বদলি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”

মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, একই পদে দীর্ঘদিন থাকলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়তে পারে। বদলির নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও একজন কর্মকর্তা কেন দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক যুগ্মসচিব জানান, একজন কর্মকর্তা কীভাবে দীর্ঘদিন একই স্থানে রয়েছেন, তা অনুসন্ধান করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জহুরুল ইসলাম বলেন, নিজের ইচ্ছায় তিনি একই কর্মস্থলে চাকরি করছেন না। কর্তৃপক্ষ বদলির আদেশ দেয়নি, তাই তিনি এখানেই রয়েছেন।