সনদ সর্বস্ব শিক্ষার অভিশাপ: প্রথাগত ডিগ্রি নয়, কর্মমুখী শিক্ষাই রূপান্তরের পথ

জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও।
বিশ্বের উন্নত ও দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—শিক্ষাব্যবস্থা কেবল কাগজের সনদ দেওয়ার কারখানা নয়; বরং তা একটি জাতি ও দেশ গড়ার প্রধান রূপান্তরকারী হাতিয়ার। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিতভাবে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালুর যে অন্ধ জোয়ার বয়ে গেছে, তা কোনো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারেনি। উল্টো, এটি সৃষ্টি করেছে লাখ লাখ হতাশ ও শিক্ষিত বেকার। রাজনৈতিক বিবেচনা ও জবাবদিহিতাহীন সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিতে পারে, আমাদের উচ্চশিক্ষা খাত তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের ইকো কলেজের প্রফেশনাল ও অনার্স কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পর্যায় এবং শিক্ষা বিশ্লেষকদের বক্তব্যে দেশের উচ্চশিক্ষার যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগের নয়; বরং এটি একটি তীব্র জাতীয় সতর্কবার্তা। পরিসংখ্যান বলছে, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে ওঠা এসব কলেজ থেকে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন, যাদের বড় একটি অংশই দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের বাজারে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। সঠিক হিসাব ও বাস্তবসম্মত নীতি নির্ধারণ ছাড়া যদি এভাবে কেবল সাধারণ শিক্ষার নামে ডিগ্রি বিতরণ অব্যাহত থাকে, তবে আগামী এক দশকে বেকারত্বের এই বোঝা প্রায় ৩০ লাখে গিয়ে ঠেকবে। কোনো উদীয়মান ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অদক্ষ ও বেকার রাখা কতটা আত্মঘাতী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিগত ৫৪ বছরে আমাদের শিক্ষানীতি ও বাস্তবায়নের মাঝে একটি বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জবাবদিহিতার অভাবে একের পর এক কলেজে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর চালু করা হয়েছে, যা না দিচ্ছে কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি, না তৈরি করছে মানসম্মত গবেষক। এই গড্ডলিকা প্রবাহ এবং ডিগ্রি সর্বস্ব মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। দেশের তরুণ সমাজকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে হলে প্রথাগত শিক্ষাক্রমের অযাচিত বোঝা একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে। সাধারণ ডিগ্রির বাজারমুখী কাটতি যেখানে শূন্যের কোঠায়, সেখানে নজর না দিয়ে সিএসই (Computer Science and Engineering), বিবিএ (BBA), বি.এড (B.Ed) ও বি.পি.এডের মতো কারিগরি, প্রাতিষ্ঠানিক ও দক্ষতাভিত্তিক কোর্সগুলোতে তাৎক্ষণিক গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সঙ্গে, শিক্ষাকে কেবল রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক না রেখে আঞ্চলিক পর্যায়কেও শিক্ষার মূলধারায় আধুনিক রূপ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঠাকুরগাঁওয়ের মতো অপার সম্ভাবনাময় সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলোকে যদি আধুনিক ‘এডুকেশন হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে ঢাকার ওপর থেকে যেমন বিপুল চাপ কমবে, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজ অঙ্গনেই আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রগুলোকে কেবল গতানুগতিক শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাজানোই এখন সময়ের বড় দাবি।

শুধু তাই নয়, একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষার পরিবেশকেও পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করা আবশ্যক। দেশের প্রায় আড়াই হাজার কলেজকে ‘গ্রীন ক্যাম্পাস’-এ রূপান্তর করা এবং সোলার প্যানেল বা সৌরশক্তি ব্যবহারের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের যে প্রস্তাব উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা খরচ কমাবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মনে জলবায়ু সচেতনতা ও পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল মানসিকতা তৈরি করবে।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালে আবদ্ধ ডিগ্রি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না; নির্ধারণ করা যায় সেই সনদ দিয়ে একজন শিক্ষার্থী সমাজ বা জাতীয় অর্থনীতিতে ঠিক কী অবদান রাখতে পারছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত কিংবা অপরিকল্পিত ডিগ্রি বিতরণের আত্মঘাতী খেলা বন্ধ করার এখনই উপযুক্ত সময়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারক কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত প্রথাগত অপ্রাসঙ্গিক কোর্সগুলো পর্যালোচনা করবে এবং দেশব্যাপী একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষানীতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবে—এটাই সময়ের দাবি।